সিলেটের বিশ্বনাথে একটি মাজারের মাসিক নিয়মিত অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন ১৭ বছর বয়সী বাউল শিল্পী পেহেলি ভৈরবী। বৃহস্পতিবারও তিনি গান গেয়ে মাজার মাতান; কিন্তু ওই অনুষ্ঠানটি ছিল তার জীবনের শেষ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে শুক্রবার (৭ আগস্ট) মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এই বাউল শিল্পী।
নিহত বাউল শিল্পী পেহেলি ভৈরবী কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চন্ডিবের এলাকার বাবুল মিয়ার মেয়ে। তিনি ওই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৯ জনের মধ্যে একজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার হযরত ছাবাল শাহর (রহ.) মাজারে বাবার সঙ্গে এসে গান গেয়েছিলেন শিল্পী পেহেলি ভৈরবী। তার গান দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে শোনেছেন। দর্শকদের সেই ভালোবাসার রেশ নিয়েই গতকাল সকালে বাবার সঙ্গে বাসে করে ফিরছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু বাড়ি ফেরা হয়নি পেহেলি ভৈরবীর।
তার মৃত্যু গানের আসরের অনেক শ্রোতাকে শোকাহত করেছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেহেলী ভৈরবীকে স্মরণ করে তার গানের প্রশংসা করেছেন। পেহেলী ভৈরবীকে যারা চেনেন, তারাও তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।
এদিন সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক ও বেঙ্গল পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে যে নয়জন নিহত হয়েছেন তার মধ্যে পেহেলি ভৈরবী একজন।
দুর্ঘটনায় নিহত বাকি আটজন হলেন- কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর থানার লক্ষ্মীপুরের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৫০), সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার চন্ডীপুরের জাহাঙ্গীরের মেয়ে ফাইজা (৩), সিলেট নগরীর সোবাহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রিতম (২২), ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৪), সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার উমনপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান (১৯), কুমিল্লা জেলার বাঙ্গুরাবাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের আ. সালামের ছেলে সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার শেরপুরের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ইমন ও কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলি থানার রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে রুবেল সুত্রধর (৩৭)
গানের অনুষ্ঠানে থাকা বিশ্বনাথের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, আমি গানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। তার বেশ কিছু ভিডিও ধারণ করেছি এবং লাইভও দিয়েছি। আমরা জানি, তার বাড়ি ভৈরবে। এর আগেও তিনি এ মাজারে এসে গান গেয়েছেন। সকালে শুনি তিনি মারা গেছেন। খুব খারাপ লাগছে শিল্পীর জন্য।
হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারের শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা সোহল আহমদ বলেন, প্রতিমাসে এক দিন মাজারে দোয়া মাহফিল হয়। দোয়া মাহফিল শেষে দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজনের জন্য গানের আয়োজন থাকে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওই মেয়েটা এসেছিল গান গাওয়ার জন্য। মেয়েটার সঙ্গে তার বাবাও ছিলেন।
তিনি বলেন, মাজারে গান গাওয়ার শিল্পী আনা-নেওয়ার বিষয়টি দেখেন জাহাঙ্গীর মিয়া। বৃহস্পতিবার গানে আসা সব শিল্পী এক গাড়িতে করে এসেছিলেন। তারা ভোরের দিকে গাড়ি নিয়ে সিলেটে চলে যান। পরে শুনেছি মেয়েটা মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়।
হয়রত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজার এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আনিছ আহমদ বলেন, “আমার বাড়ির পাশেই মাজার, গান হলে শব্দ শুনতে পাই। বৃহস্পতিবার রাতে গানের শব্দ শুনেছি। আমি গানে যাইনি। মাজারে প্রায় সময় গান-বাজনা হয়ে থাকে।”
এ বিষয়ে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান বলেন, নিহত নয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। মরদেহগুলো তাদের পরিবারের হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।