শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) পরিচয় দিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও ক্যাম্পাসে পুলিশ পাঠানোর ভয় দেখিয়ে তারা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডজনেরও বেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের বিবরণ অনুযায়ী, প্রতারণার শুরু হয় একটি ফোনকলের মাধ্যমে। ভুয়া পুলিশ কর্মকর্তা প্রথমে ভুক্তভোগীকে তার লেনদেনের কিছু অতি গোপনীয় তথ্য নির্ভুলভাবে জানান—যেমন কত টাকা, কোন সময়ে এবং কোথায় লেনদেন করা হয়েছে। এসব তথ্য সাধারণত গ্রাহক ও মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের বাইরে কারও জানার কথা নয়। নির্ভুল তথ্য শুনে ভুক্তভোগীরা সহজেই প্রতারকদের বিশ্বাস করে ফেলেন।
এরপর শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। প্রতারকরা জানায়, ভুক্তভোগীর লেনদেনের ঠিক আগে ওই একই দোকানে জাল টাকার একটি লেনদেন হয়েছে এবং নম্বরের আংশিক মিল থাকায় মামলায় ভুক্তভোগীর নাম চলে এসেছে। এরপর মামলা, গ্রেপ্তার এবং ক্যাম্পাসে পুলিশ পাঠানোর ভয় দেখিয়ে মানসিকভাবে আতঙ্কিত করা হয়। একপর্যায়ে ওটিপি বা অন্য কৌশলে অ্যাকাউন্টের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টাকা আত্মসাৎ করে চক্রটি।
প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন সিনিয়র শিক্ষিকাও দেড় লাখ টাকা খুইয়েছেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। লেভেল-১ এর শিক্ষার্থী মাহবুব আহমেদ ফাহিম ও তার মায়ের কাছ থেকে ব্ল্যাকমেইল করে মোট ৬০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। ল্যাপটপ কেনার জন্য পরিবারের পাঠানো ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা হারিয়েছেন লেভেল-২ এর শিক্ষার্থী সুরাইয়া আফরিন রিশা।
প্রতারণার শিকার আরেক শিক্ষার্থী মোছা. মোবাশ্বিরা মুস্তারিন জানান, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মিনিবাজারের ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’ থেকে টাকা তোলার পরদিন তাকে ফোন করে জাল টাকার ভুয়া মামলার ভয় দেখানো হয়। তার নগদ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ওটিপি এবং ক্যাশ ইনের মাধ্যমে মোট ২০ হাজার ৩০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই একই দোকান থেকে লেনদেন করা আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারণার শিকার সবাই ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’ নামের ওই নির্দিষ্ট দোকান থেকে লেনদেন করেছিলেন। লেনদেনের পরপরই সময়, টাকার পরিমাণ ও মাধ্যমের মতো সংবেদনশীল তথ্য প্রতারকদের কাছে নিখুঁতভাবে পৌঁছে যাওয়ার কারণে তারা ওই এজেন্ট পয়েন্টের সঙ্গে চক্রের যোগসাজশ থাকার সন্দেহ করছেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে দোকানটির সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এই জালিয়াতির ঘটনায় ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আরফান আলী বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শেরেবাংলা নগর থানার সঙ্গে আমরা সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রাখছি এবং তারাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’
তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, জিডি হওয়ার পর তদন্ত শুরু হলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে কেউ টাকা বা ওটিপি চাইলে তা কোনোভাবেই শেয়ার না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।