শিক্ষাক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গ করার পর অবসরে এসে নিজেদের ন্যায্য পাওনার জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে বাধ্য হওয়ায় এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবসরে গিয়ে চিকিৎসা, সংসার পরিচালনা বা সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় মেটাতে অনেকেই ঋণে জর্জরিত।
চার বছরের বেশি সময় ধরে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী। শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী প্রাপ্য পাওয়ার আগেই মারা গেছেন। ছয় মাসের মধ্যে অবসরকালীন সুবিধা প্রদানের জন্য হাইকোর্টের একটি নির্দেশও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশ মানা হয়নি।
অবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চরম দুর্দশার মুখে পড়া এসব শিক্ষক-কর্মচারীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের অবসর ও কল্যাণের টাকা পরিশোধে এককালীন ২ হাজার কোটি টাকা বিশেষ থোক বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অতি দ্রুত এই টাকা ছাড়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশও দেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ১৫ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা একযোগে পাচ্ছেন অবসর-কল্যাণের টাকা। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, মহতি এই উদ্যোগের আওতায় অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৪৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অর্থ পেতে পারেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরতে আগামী ১৩ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে। জানা গেছে, এবার প্রথম বারের মতো ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (সফটওয়্যার)-এর মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হবে। এতে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কোনো সুযোগ থাকবে না। শিক্ষক নেতারা বলেন, সরকারের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ফলে জীবনের শেষ বয়সে চরম আর্থিক ও চিকিৎসাসংকটে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে আসবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় এককালীন অর্থ বিতরণ কর্মসূচি।
কেন এত দিন আটকে ছিল: অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকার বড় একটি অংশ নেওয়া হয় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকেই। অবসর সুবিধার জন্য চাকরিকালীন তাদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ টাকা মাসে কেটে রাখা হয়। কল্যাণ সুবিধার জন্য কাটা হয় মূল বেতনের ৪ শতাংশ। এছাড়া সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসর তহবিলে এবং ৩০ টাকা কল্যাণ তহবিলে জমা হয়। বাকি অর্থ সরকারি সহায়তা ও তহবিলের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে সমন্বয় করা হয়। কিন্তু গত ১৭ বছরে সেই জামানতের অনেক টাকাই বেহাত হয়েছে। আবার দুর্বল ব্যাংকেও অনেক টাকা আটকে রয়েছে। এছাড়া আগের সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর বাজেটে বরাদ্দ না দেওয়ায় অবসর বোর্ডে প্রতি মাসে ঘাটতি ছিল ৪২ কোটি টাকা। অন্যদিকে কল্যাণ ট্রাস্টে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যায় ১৩ কোটি টাকা। এ কারণে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন জমা বাড়তে থাকে। অথচ শেষ জীবনের সম্বল বলতে তাদের অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের এককালীন টাকা। শেষ জীবনে শিক্ষকরা হজ করা, নিজের চিকিৎসা, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো, মেয়ের বিয়ে বা ছেলেকে ব্যবসা ধরিয়ে দিতে এই টাকার ওপরই ভরসা রাখেন। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে যেসব শিক্ষক অবসরে গেছেন, তারা অবসর-কল্যাণের টাকা না পেয়ে রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে। এই টাকা পেতে তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরছিলেন। বিএনপি সরকারের মেয়াদ ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী তাদের টাকা পরিশোধের অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য তার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছে শিক্ষকসমাজ।
আড়াই বছর আগে হাইকোর্টের নির্দেশনা ছিল, ‘অবসরের ছয় মাসের মধ্যে অবসরকালীন সুবিধা প্রদান করতে হবে’: এদিকে গত ২ সেপ্টেম্বর ১৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেন আদালত। তারও আগে ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষক ও কর্মচারীকে অবসরের ছয় মাসের মধ্যে অবসরকালীন সুবিধা প্রদানের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। ঐ রায়ে আদালত বলে, শিক্ষকদের রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট (অবসরকালীন সুবিধা) পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। এই হয়রানি থেকে তারা কোনোভাবেই পার পান না। একজন শিক্ষক কত টাকা বেতন পান, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য তাদের অবসর ভাতা ছয় মাসের মধ্যে দিতে হবে। এই অবসর ভাতা পাওয়ার জন্য শিক্ষকরা বছরের পর বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে পারেন না বলেও মন্তব্য করে আদালত।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণের টাকা পরিশোধে এককালীন ২ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন।