বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখতে ইরানের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে ওমান। তবে সমঝোতা হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি তাৎক্ষণিকভাবে খুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা নেই বলে জানিয়েছে তেহরান।
রোববার (৯ আগস্ট) রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
এদিকে প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আরও কয়েকটি শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
আব্বাস আরাগচি বলেন, প্রণালি দিয়ে নতুন একটি জাহাজ চলাচলের রুটের বিষয়ে ইরান ও ওমান চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ রয়েছে। তবে পথটি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করছে।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিংটন আশা করছে ইরান ও ওমানের মধ্যে শিগগিরই একটি চুক্তি হবে। দেশ দুটি এই প্রণালির দুই পাশে অবস্থিত। চুক্তিটি হলে তেলের স্বাভাবিক পরিবহন আবার শুরু হতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত যে জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়, সেই হরমুজ প্রণালি ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যত অবরোধ করে রেখেছে ইরান। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন পথ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই পথের নিরাপত্তার দায়িত্ব দুই দেশ যৌথভাবে পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে চুক্তি নিয়ে এসব আশা জাগানো কথার মধ্যেই গতকাল হরমুজ প্রণালিতে আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
এর আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়, তা অবসানে একটি বৃহত্তর চুক্তি জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। আর সেই চুক্তির অংশ হিসেবেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যকার সমঝোতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই যুদ্ধের কারণেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি রপ্তানির অন্যতম প্রধান এই নৌপথটিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে তেহরান।
এদিকে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মদ বাকের জোলকদর আধা সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার আচরণ ‘সংশোধন’ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ছয়টি দাবি পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি ‘শিগগিরই’ হতে পারে। তবে শনিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ বিষয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক কাজ বাকি।
ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এখনো খেলার মাঝামাঝি অবস্থায় আছি। বিষয়টি এখনো শেষ হয়নি।’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মার্কিন জনগণের জন্য সর্বোত্তম ফল নিশ্চিত করতে আমরা কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক-সব ধরনের উপায় কাজে লাগাচ্ছি।’
ভ্যান্স আরও দাবি করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর আগের মতোই উপসাগর থেকে ‘একই পরিমাণ তেল’ সরবরাহ হবে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন মূলত এমন একটি ট্রাফিক ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছি, যাতে জাহাজগুলো নিরাপদে প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারে।’
এদিকে প্রণালি পার হওয়ার সময় জাহাজগুলোয় বারবার হামলার নিন্দা জানিয়েছে ওমান। তবে এর জন্য তারা কাউকে সরাসরি দায়ী করেনি। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ হয়েছে বলে জানিয়েছে ওমান।
ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার ওপর জোর দিচ্ছে ওমান। আলোচনাটি এমনভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যেখানে সব পক্ষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করা হয়েছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের আগের নিয়মটি তেহরানের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। একটি স্থায়ী রুটের প্রযুক্তিগত ও আইনি সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী রুট নিয়ে আলোচনা করছে ইরান।
এদিকে চুক্তি করার জন্য এখনই সেরা সময় বলে মনে করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।