সিজিইপি’র সংলাপ

বিচ্ছেদের পর শিশুর অভিভাবকত্বে মায়ের স্বীকৃতির দাবি

শিশুর সুরক্ষা, পরিচর্যা ও বিকাশ কেবল পরিবারের একার দায়িত্ব নয়—এ দায়িত্ব সমাজের, প্রতিষ্ঠানের, রাষ্ট্রের ও আইনের। কিন্তু বাংলাদেশে অভিভাবকত্ব-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনের পথে নিজেই একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বিচ্ছেদের পরে বাবা-মায়ের সমান দায়িত্ব এবং শিশুর অভিভাবকত্বে মায়ের স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়েছে।

‘শিশুদের অভিভাবকত্ব সম্প্রসারণ প্রস্তাব’ (সিজিইপি) নামের শিশু কল্যাণকেন্দ্রিক উদ্যোগের যাত্রা শুরু উপলক্ষে শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তারা এ সব কথা বলেন। বিচ্ছেদের পরে বাবা-মায়ের সমান দায়িত্ব এবং শিশুর অভিভাবকত্বে মায়ের স্বীকৃতির দাবি জানান তারা।

সিজিইপি’র আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট দিলরুবা শরমিন উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘সিজিইপি’র যাত্রা একটি সাধারণ অথচ জরুরি প্রশ্ন থেকে শুরু—আইন যখন সন্তানের প্রকৃত পরিচর্যাকারীকে চিনতে ব্যর্থ হয়, তখন মূল্য দেয় কে? সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘এমন মায়েদের তিনি বারবার দেখেছেন যারা সন্তানের জন্ম থেকে প্রতিটি প্রয়োজন একা মিটিয়েছেন, অথচ স্কুলে ভর্তির ফর্মে স্বাক্ষর করার আইনি অধিকার তাদের নেই; জরুরি মুহূর্তে সন্তানের চিকিৎসার সম্মতিপত্রে সই করতে গিয়ে যারা জানতে পেরেছেন, আইনের চোখে তারা অভিভাবক নন—পিতা অনুপস্থিত ও কোনো সহযোগিতা না থাকা সত্ত্বেও।

সংলাপে কী-নোট উপস্থাপন করেন সিজিইপি’র গবেষক তৃষিয়া নাশতারান। তিনি বলেন, ‘‘শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ’—এই প্রচলিত কথাটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখা দরকার। শিশুরা শুধু ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়, তারা বর্তমানের বাস্তবতা, আর সেই বাস্তবতার একটি বড় অংশ নির্ধারিত হয় ১৮৯০ সালে প্রণীত একটি আইনি কাঠামো দিয়ে, যার সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের পারিবারিক বাস্তবতার দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে।’

অভিনয়শিল্পী, ভুক্তভোগী মা আজমেরী হক বাঁধন বলেন, ‘২০১৪ সালে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর তিন বছর তিনি সন্তানের বাবার কথামতো চলেছেন, সন্তানের ভরণপোষণের খরচ না পেয়েও কিছু বলেননি—সমাজের নিয়ম মেনে নিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে সন্তানের বাবা পুনর্বিবাহ করেন এবং সন্তানকে আটকে রাখার চেষ্টা করেন, আইনজীবীর মাধ্যমে সন্তানকে নিয়ে কানাডায় চলে যাওয়ার সম্মতিপত্র পাঠান। বাঁধনের আইনজীবী তাকে জানান, আইনত বাবা এটি করতে পারেন, কারণ তিনিই ন্যাচারাল গার্ডিয়ান।

বাঁধন বলেন, ‘এই অভিজ্ঞতা থেকে তার মনে হয়েছে যেন মাকে কেবল একটি জরায়ু হিসেবে ব্যবহার করে সরিয়ে দেয়া যায়।’ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বাঁধন তার কন্যার গার্ডিয়ানশিপ অর্জন করেন, কিন্তু বলেন, ‘আমার একার পাওয়ায় কিছু এসে যায় না—আরও অনেক নারী আছেন যারা এই কষ্ট ভোগ করছেন।’ তার সন্তান এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে; জন্ম থেকে তার সব দায়িত্ব তিনি একা বহন করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ হতেই পারে, শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক নাও থাকতে পারে—কিন্তু সন্তান যেন বড়দের ইগোর বলি না হয়।’

ওয়ারদা আশরাফ নামে আরেক অভিভাবক জানান, ২০১৮ সালের অক্টোবরে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তখন তার প্রাক্তন স্বামী কর্মহীন ছিলেন এবং তারা একান্নবর্তী পরিবারে থাকতেন; স্বামী, সন্তান ও সংসারের পুরো দায়িত্ব তিনি একাই বহন করতেন। বাড়ি ছাড়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন সন্তানেরাও (৫ বছর ও আড়াই বছর বয়সী) তার সঙ্গেই যাবে। কিন্তু বাস্তবে তার অভিজ্ঞতা হয় ভিন্ন। শ্বশুরবাড়ি ছাড়ার সময় তাকে কোনো জিনিসপত্র নিতে দেয়া হয়নি এবং সন্তানদের পরে তার কাছে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা রক্ষা করা হয়নি। কিছু আইনজীবী তাকে স্বামী ও শ্বশুরপক্ষকে খারাপভাবে উপস্থাপনের পরামর্শ দিলেও তিনি এই সাংঘর্ষিক অবস্থানের বিপক্ষে ছিলেন; পরে অন্য একজন আইনজীবীর পরামর্শে তিনি মামলা করেন। সেই মামলা দীর্ঘায়িত হয়। তাকে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হতো না এবং তাকে তীব্র মানসিক চাপে রাখা হতো। এক পর্যায়ে তিনি নিজের সন্তানদের নিয়ে আসেন। তাতে সন্তানরা খুশি হলেও বাবাকে মিস করত। তার প্রাক্তন স্বামী বিভিন্ন কুৎসা রটিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করেন—সন্তানদের প্রতি টান থেকে নয়, তাকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে, বলে তিনি মনে করেন।

আইনি ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা ও প্রস্তাবনা
দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘তাদের ভাবনার কেন্দ্রে শিশু। তিনি বিশ্বাস করেন মা-বাবা উভয়েই শিশুর কল্যাণ চান, তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দায়বদ্ধতা প্রয়োজন, কারণ আজকের শিশু আগামীর নাগরিক। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সিজিইপি’র প্রস্তাবনা ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোর্টের উদ্যোগ থেকে ভিন্ন। সিজিইপি বর্তমান আইনি কাঠামো বহাল রেখে শিশুর সর্বোত্তম মঙ্গলের জন্য একটি নতুন পথ খুঁজছে।’

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘আজকের সংলাপে যারা আদালত পর্যন্ত যেতে পেরেছেন তাদের কথা শোনা গেছে, কিন্তু শহরের বাইরে থাকা কিংবা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মায়েদের দহন এখনও অশ্রুত। যারা গার্ডিয়ানশিপ পেয়েছেন তাদের বেদনাও যে গার্ডিয়ানশিপ পাবার মধ্য দিয়ে শেষ হয়, এমন না। বরং অভিভাবকত্ব পাবার পরে একা দায়িত্ব পালন করা এবং সমাজের অসহযোগিতা নারীকে আরো বিপন্ন করে তোলে। বিচ্ছেদ বা সেপারেশনের ক্ষেত্রে প্রথম অভিযোগ আসে নারীর ওপর এবং আইন ব্যবস্থাই প্রায়ই অপর পক্ষকে অপদস্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করে। এহেন পরিস্থিতিতে পরিবারের সহযোগিতা করার কথা থাকলেও তা প্রায়ই পান না নারীরা। এই সংগ্রাম আদালতের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু
সংরক্ষিত আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ নিজের পরিচিত দু’টি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন—একজনকে তার দুই সন্তান থেকে বঞ্চিত করার পর মানসিক ভারসাম্য হারানোর ঘটনা এবং আরেকজনকে বারবার সন্তান জন্মের পর সেই সন্তান কেড়ে নেওয়ার ঘটনা, যা তার ভাষায় নারীকে কেবল জরায়ু হিসেবে ব্যবহারের শামিল। সিজিইপিকে এই সংলাপ আয়োজন এবং কয়েকজন পুরুষকে অংশগ্রহণে যুক্ত করার জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি সন্তান জন্মের পর নারীর শরীর, মন ও স্মৃতি বদলে যায়—আইন এই বাস্তবতাকে কীভাবে দেখছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘কোনো শিশুকে কখনো মা-বাবার মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। ছেলে সন্তানকে বার্ধক্যের অবলম্বন ভাবা এবং তার ওপর উপার্জনের দায় চাপিয়ে দেওয়ার সময় ধর্ম, কেয়ারগিভিং কিংবা রাষ্ট্র এগিয়ে আসে না, অল্প বয়সে অভিবাসনে পাঠানো ছেলে সন্তানের ভালোমন্দ নিয়ে ভাবা হয় না, শুধু আয়ের দিকটাই দেখা হয়। সন্তানকে সম্পত্তি ভাবার এই প্রবণতা বদলানো প্রয়োজন।’

সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী বলেন, ‘‘আইনজীবী হিসেবে ‘বেস্ট ইন্টারেস্ট অফ চাইল্ড’-কে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালতে অনেক মামলা দেখার সুযোগ তার হয়েছে। বাংলাদেশে বিয়ে, বিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, কাস্টডি, গার্ডিয়ানশিপ ও উত্তরাধিকারসহ ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সব আইনি সিদ্ধান্ত পারসোনাল ফ্যামিলি ল দিয়ে পরিচালিত হয়; ইউনিফায়েড ফ্যামিলি কোর্ট বা সিভিল ল নেই, যা দীর্ঘদিনের একটি চাওয়া। দেশের অর্ধেক নাগরিক-ভোটার নারী, অথচ সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হয়ে আসা নারী সদস্য হাতে গোনা।’

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন আদালত-কেন্দ্রিক বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, ‘আইনজীবীরা প্রায়ই যে অবস্থান নেন তা সমস্যাজনক হয়ে দাঁড়ায়—যারা গুম-খুনের মতো বিষয়ে অভিজ্ঞ, পারিবারিক সহিংসায় তাদের অভিজ্ঞতা কম, আর পারিবারিক মামলায় দক্ষ পুরুষ আইনজীবী পাওয়াও কঠিন।’

‘শিশুর সর্বোত্তম মঙ্গল’-এর কথা বলার সময় সেই নীতি বাস্তবে চর্চা হচ্ছে কি না, সেটিও দেখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন—প্রায়ই দেখা যায়, বাবা শক্তিশালী আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে সন্তানের নিয়ন্ত্রণ নেন, কিন্তু নিজে লালনপালন করেন না। সুপ্রিম কোর্ট পর্যায়ে জাতীয় মধ্যস্থতার উদ্যোগ এখন এগিয়ে চলছে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘নারী যখন একা হয়ে পড়েন, তখন রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামের মাধ্যমে তার পাশে কাউকে রাখার প্রক্রিয়া দরকার, এবং প্রাথমিক পর্যায় থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং সুবিধা থাকা প্রয়োজন।’

আলোকচিত্রশিল্পী ও সমাজকর্মী শহিদুল আলম বলেন, ‘দৃকে এর আগে কখনো অভিভাবকত্বের মতো এত মৌলিক একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি, যা তাঁকে ভাবিয়েছে। তিনি বহু বছর আগে নূরজাহানের ঘটনার প্রসঙ্গ তোলেন—তখন লিঙ্গ ও ক্ষমতার বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে এলেও, রায়ের সময় সংবাদমাধ্যমের কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। কোন বিষয়কে কেন গুরুত্ব দেওয়া হয়—তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং এত লড়াকু মানুষকে একসঙ্গে দেখতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।’

মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান তিনটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। প্রথমত, শিশু কারও সম্পত্তি নয় এবং সে ইতিমধ্যেই একজন নাগরিক—অথচ আজকের আলোচনায় মা-বাবা, নারী-পুরুষের কথা শোনা গেলেও শিশুর নিজের কণ্ঠ অনুপস্থিত; কৈশোরে মা হওয়া কোনো মেয়ের অভিজ্ঞতাও শোনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এই সমস্যার সামগ্রিক সমাধান কেউ এখনো করতে পারেনি, তাই ছোট ছোট সমাধানের মধ্য দিয়েই বৃহত্তর সমাধানের দিকে এগোতে হবে — কাস্টডি ও গার্ডিয়ানশিপ নিয়ে প্রচলিত কিছু তাত্ত্বিক ভুল ধারণাও দূর করা দরকার, যেমন গার্ডিয়ানশিপ থাকা বা না-থাকার সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়িত্বের সরাসরি সম্পর্ক নেই বলে ধরে নেয়া। তিনি সাংঘর্ষিক প্রক্রিয়া থেকে সরে মধ্যস্থতা ও বোঝাপড়ার দিকে যাওয়ার এবং অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পরামর্শ দেন। তৃতীয়ত, তিনি বলেন, এই সমস্যা কেবল রাষ্ট্রের নয়, সমাজেরও—পার্লামেন্টে ক্রস-পার্টি ককাস গঠন করে কাজ করা সম্ভব, যেমনটি তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব থাকাকালে নেপালে নারীদের করতে দেখেছিলেন।

সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক গীতিয়ারা নাসরীন, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন, শ্রমিক ও নারী অধিকারকর্মী তাসলিমা আখতার, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, আলোকচিত্রশিল্পী শহিদুল আলম, অধিকারকর্মী রেহনুমা আহমেদ, নাগরিক কোয়ালিশনের সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, ব্লাস্টের আইনজীবী আয়েশা আক্তার প্রমুখ বক্তব্য দেন।