পবিত্র মক্কা নগরীতে সম্প্রতি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে গঠিত এই চুক্তিতে বিধান রাখা হয়েছে। তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা চালানো হলে, তা পুরো জোটের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। রোববার (৯ আগস্ট) মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
যৌথ বিবৃতিতে সামরিক প্রতিশ্রুতির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশ না করা হলেও, মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী এই তিন পরাশক্তির সম্মিলিত নিরাপত্তা ফ্রন্ট ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তানের জন্য এটি বড় পরিবর্তন। দীর্ঘদিন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা ইসলামাবাদ এখন নিজেকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নতুন নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের পাশে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের এই অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যখন চাপের মুখে, তখন আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের জ্বালানি ও সার রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমদানিনির্ভর পাকিস্তান ও তুরস্কও এ সংকটে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
একজন পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আরও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো তিন দেশেরই অভিন্ন স্বার্থ। শেষ পর্যন্ত এটিই তাদের চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করেছে। সৌদি আরব ও তুরস্ক ইতোমধ্যে আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব অনুভব করেছে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা সীমান্ত অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। তুরস্কের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি হলো, বাইরের শক্তি যদি ইরানি কুর্দি মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ করে, তাহলে পিকেকের সঙ্গে নাজুক শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে যেতে পারে।
হুথিদের সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি এই চুক্তিকে ‘উদীয়মান আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রথম বাস্তব ভিত্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিন দেশের মধ্যে গভীরতর নিরাপত্তা সহযোগিতার স্বাভাবিক পরিণতিই এই চুক্তি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রায় আট হাজার পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়। তুরস্ক দুই দেশকেই বড় পরিসরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য চুক্তিটি শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। ঐতিহাসিকভাবে দেশটি সামরিক সক্ষমতাকে অর্থনৈতিক সহায়তা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। নতুন কাঠামোয় যৌথ প্রশিক্ষণ, সেনা মোতায়েন ও অস্ত্র রপ্তানির বিনিময়ে উপসাগরীয় বিনিয়োগ, জ্বালানি সুবিধা ও কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহরিয়ার খান বলেন, সৌদি আরব দিচ্ছে অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্ক দিচ্ছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আর পাকিস্তান দিচ্ছে মূল সামরিক সক্ষমতা। একসঙ্গে এই তিন দেশ প্রচলিত সেনা মোতায়েনের সীমা ছাড়িয়ে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে।
তবে ঝুঁকিও কম নয়। ইরান ইতোমধ্যে কঠোর ভাষায় চুক্তির সমালোচনা করেছে। ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি বলেন, সৌদি আরবের জানা উচিত, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজে করা চুক্তি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলে তেহরানের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ‘ফাঁদে আটকে পড়ার’ আশঙ্কাও রয়েছে, এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া যা দেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পাকিস্তানে বড় শিয়া জনগোষ্ঠী থাকায় সৌদি-তুর্কি জোটকে ইরানবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা হলে অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক বিভাজন তীব্র হতে পারে বলেও সতর্ক করা হচ্ছে।
চুক্তিটি ভবিষ্যতে বৃহত্তর ‘মুসলিম নিরাপত্তা জোট’-এ রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ এতে যোগ দিতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে এ ধরনের জোটের সাফল্য নিশ্চিত হবে না। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও সাম্প্রদায়িক সহনশীলতাই প্রকৃত শক্তি হতে পারে।
ইসরাইলের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট আগেই সতর্ক করেছিলেন, পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে সঙ্গে নিয়ে তুরস্ক যেন ইসরায়েলকে ঘিরে ‘শত্রুভাবাপন্ন অক্ষ’ গড়ে তুলতে না পারে।
চুক্তির প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা ঘটনাপ্রবাহ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতীয় বিশ্লেষকরা এটিকে নয়াদিল্লির স্বার্থের জন্য নেতিবাচক বলে মনে করছেন। সাবেক পররাষ্ট্রসচিব কানওয়াল সিবাল পরামর্শ দিয়েছেন, ভারত যেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরাইল, গ্রিস, সাইপ্রাস ও আফগানিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত বিকল্প আরও বিস্তৃত করে।
মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এটি কতদূর এগোবে এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।