সম্পর্কের প্রথাগত খোলস থেকে বেরিয়ে আসছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ‘হলিউড’। পর্দা ও টেলিভিশনে দীর্ঘদিন ধরে ‘বয়সে বড় পুরুষ এবং কমবয়সী নারী’র প্রেম দেখানো হলেও, এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘বয়সে বড় নারী ও কমবয়সী পুরুষ’র রসায়ন। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, পর্দার এই নতুন রূপ শুধু কাল্পনিক নয়, বাস্তব জীবনেও এই ধরনের সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘আই ওয়ান্ট ইওর সেক্স’ সিনেমা। এটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এরিকা ট্রেসি একজন ৩০-এর শেষ দিকে থাকা সমকালীন শিল্পী। তার সহকারী এলিয়ট ২৩ বছর বয়সী, এলোমেলো স্বভাবের এক তরুণ।
‘আই ওয়ান্ট ইওর সেক্স’ আসলে হলিউডে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমেই বেশি দেখা যাওয়া বয়স্ক নারী ও কমবয়সী পুরুষের সম্পর্কের আরেকটি সংস্করণ। এর আগে ‘দ্য আইডিয়া অব ইউ’ ছবিতে এক বিবাহবিচ্ছিন্ন গ্যালারির মালিকের সঙ্গে বয়ব্যান্ড তারকার অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, ‘বেবিগার্ল’ সিনেমায় ছিল এক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তার তরুণ ইন্টার্নের অস্বাভাবিক সম্পর্ক।
এ তালিকায় রয়েছে ‘ড্রিমস’, যেখানে এক সমাজের উচ্চবিত্ত নারীর সঙ্গে নথিবিহীন এক মেক্সিকান অভিবাসীর সম্পর্কের গল্প বলা হয়েছে। নেটফ্লিক্সের ‘ভ্লাদিমির’- মিনি সিরিজে দেখা যায়, কম বয়সী এক সহকর্মীর প্রতি নারী অধ্যাপকের তীব্র আকর্ষণ। আর ‘ব্রিজেট জোন্স: ম্যাড অ্যাবাউট দ্য বয়’-এর গল্পের নামই বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট করে দেয়।
সিনেমার পাশাপাশি হলিউডের বাস্তবতাভিত্তিক অনুষ্ঠানও পিছিয়ে নেই। ‘এমআইএলএফ ম্যানর’ ও ‘এজ অব অ্যাট্রাকশন’-এর মতো রিয়েলিটি শোতেও এই প্রবণতা জায়গা করে নিয়েছে।
অবশ্য বয়সে বড় নারী ও কমবয়সী পুরুষের সম্পর্কের প্রতি চিত্রনাট্যকারদের আগ্রহ নতুন নয়। ১৯৬৭ সালের ‘দ্য গ্র্যাজুয়েট’ সিনেমার মিসেস রবিনসন ছিলেন প্রায় কার্টুনের মতো এক প্রলোভনসঞ্চারী নারী। এই চরিত্রই আকর্ষণীয় বয়স্ক নারীর একটি আদর্শ রূপ তৈরি করেছিল।
১৯৯৯ সালের ‘আমেরিকান পাই’ ছবিতেও ছিল ‘স্টিফলারের মা’ নামে পরিচিত এক আকর্ষণীয় নারী চরিত্র। আর ‘কুগার টাউন’-এর মতো টেলিভিশন সিরিজে কমবয়সী প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কের রোমাঞ্চ তুলে ধরা হয়েছে।
তবে বর্তমান প্রবণতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো- এ ধরনের সম্পর্ক এখন শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই; বাস্তব জীবনেও এর উপস্থিতি বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে অবিবাহিত কিন্তু একসঙ্গে বসবাসকারী ‘স্ট্রেইট’ বা ‘বিষমকামী’ দম্পতিদের ২২ শতাংশের ক্ষেত্রে নারী ছিলেন পুরুষের চেয়ে বয়সে বড়। ১৯৯৫ সালে এই হার ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
গত বছর ডেটিং ওয়েবসাইট ‘ম্যাচ ডট কম (Match.com)’-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবিবাহিত পুরুষদের ৩০ শতাংশ এমন কারও সঙ্গে ডেট করেছেন, যিনি তাদের চেয়ে অন্তত ১০ বছর বয়সে বড়।
‘কৌতূহলী’ মানুষের জন্য তৈরি ডেটিং অ্যাপ ‘ফিলড (Feeld)’-এর তথ্যও একই প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করছে। সেখানে বয়স্ক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজছেন- এমন পুরুষদের ৭৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। দুই বছর আগে এই হার ছিল ৬৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এটি তাদের দেখা ‘সবচেয়ে স্পষ্ট পরিবর্তনগুলোর একটি’।
সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
নারীরাও এই পরিবর্তন টের পাচ্ছেন। সম্প্রতি প্যারিসের এক সন্ধ্যায় ৫৯ বছর বয়সী এক নারী জানান, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ডেটিং অ্যাপ ‘হিনজ (Hinge)’-এ নয়জন পুরুষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের চারজনের বয়স ছিল ২০-এর কোঠায়। সবচেয়ে বেশি বয়সী একজনের বয়স ছিল ৪২।
তার ধারণা, যারা তাকে বার্তা পাঠান, তাদের অন্তত তিন-চতুর্থাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে।
কেন বিনোদন জগৎ ও বাস্তব জীবনে এই প্রবণতা বাড়ছে? এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
এর একটি হলো তারকাদের প্রভাব। ২০০৫ সালে ডেমি মুরের বয়স ছিল ৪২ ও অ্যাশটন কুচারের ২৭। তাদের বিয়ে সেসময় বেশ বিতর্ক তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন ক্রিস জেনার, জেনিফার লোপেজ, টিল্ডা সুইনটন ও ম্যাডোনার মতো অনেক বয়সী নারী তারকারই কমবয়সী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে।
আরেকটি কারণ হতে পারে যৌনতা সম্পর্কে মানুষের পরিবর্তিত ধারণা। সংক্ষেপে বললে, অনেক নারীই এমন সম্পর্ক চান।
গবেষণাকেন্দ্র কিনসে ইনস্টিটিউট- এর গবেষক জাস্টিন লেহমিলার ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিষমকামী বা স্ট্রেইট নারীদের ওপর গবেষণা করেছিলেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, মধ্যবয়সী নারীদের ৬৪ শতাংশ অন্তত একবার কমবয়সী পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা ভেবেছেন। ১৩ শতাংশ নারী এমন সম্পর্ক নিয়ে নিয়মিত কল্পনা করেছেন।
পর্নোগ্রাফির তথ্য বলছে, অনেক পুরুষের কাছেও এই ধরনের সম্পর্ক আকর্ষণীয়। প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং এ শিল্প নিয়ে পডকাস্ট পরিচালনাকারী হলি র্যান্ডাল বলেন, ডার্টি ম্যাগাজিন ও ডিভিডির যুগে অল্প কয়েকজন পরিচালক ও পরিবেশক এই শিল্পের দর্শকদের পছন্দ নির্ধারণে এক ধরনের গেটকিপারের ভূমিকা পালন করতেন।
তার ভাষায়, ১৫ বা ২০ বছর আগে ‘মিলফ’ বলে কোনো আলাদা ধারণাই ছিল না। তখন কোনো নারী ২৮ বছর বয়সে পৌঁছালে তার ক্যারিয়ার শেষ- এমন ধারণা প্রচলিত ছিল।
কিন্তু পরে দেখা যায়, মানুষের যৌন পছন্দ ওই গেটকিপারদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। গত বছর ‘প্রাপ্তবয়স্ক ভিডিওর’ একটি ওয়েবসাইটে -এ ‘Milf (মধ্যবয়সী নারী)’ ছিল দ্বিতীয় সর্বাধিক সার্চ করা শব্দ। তাছাড়া ‘অনলিফ্যানস (OnlyFans)’-এর মতো প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোওতেও ৫০ ও ৬০-এর কোঠার কিছু নারীদের প্রতি ‘অবিশ্বাস্য রকমের আকর্ষণ’ পাওয়া গেছে।
বদলে যাচ্ছে শিক্ষা ও কর্মজীবনের চিত্রও
বয়স্ক নারী ও কমবয়সী পুরুষের সম্পর্ক বাড়ার পেছনে বৃহত্তর জনমিতিক পরিবর্তনও ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক ধনী দেশে নারী ও পুরুষের শিক্ষাগত অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এই ব্যবধানের প্রভাব চাকরির সুযোগ ও আয়েও দেখা যাচ্ছে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী পুরুষদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ পড়াশোনা করছে না, কাজও করছে না বা কাজের সন্ধানও করছে না।
একই সময়ে তরুণ নারী ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিও একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তরুণীরা ক্রমশ বেশি উদারনৈতিক হয়ে উঠছেন, আর তরুণ পুরুষদের মধ্যে ডানঘেঁষা রাজনৈতিক প্রবণতা বাড়ছে।
২০২৪ সালে সীমিত পরিসরে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব নারীর সঙ্গীর বয়স তাদের চেয়ে প্রায় সাত থেকে ১০ বছর কম, তারা সমবয়সী সঙ্গীর সঙ্গে থাকা নারীদের তুলনায় বেশি সুখী ও যৌন আত্মবিশ্বাসেও এগিয়ে।
সাম্প্রতিক সামাজিক আন্দোলনও এই প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। সম্মতি ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন যে সতর্ক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তাতে কিছু তরুণ পুরুষ প্রেমের সম্পর্কের নিয়মকানুন নিয়ে অনিশ্চিত বোধ করছেন।
ম্যাচ ডট কমের -এর গবেষণায় ৭২ শতাংশ জেন জি উত্তরদাতা বলেছেন, প্রথমবার এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে ‘আরও বেশি নিষ্ক্রিয়তা’ দেখা যাচ্ছে। সামগ্রিক উত্তরদাতাদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬৩ শতাংশ। অনেকেই প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কাও করেন।
এদিকে, পর্দায় অন্তত বয়সে বড় নারীদের সাধারণত এমনভাবে দেখানো হয়, যেন তারা কী চান তা খুব ভালোভাবেই জানেন এবং সেটা চাইতে দ্বিধা করেন না।
তবে হলিউডের সিনেমায় যেমন, বাস্তব বিয়ের ক্ষেত্রেও কমবয়সী পুরুষকে খুব কমই দীর্ঘমেয়াদি সঙ্গী হিসেবে দেখা যায়। ডেমি মুরের দিকেই তাকানো যেতে পারে- তিনি এখন বিচ্ছিন্ন।
গবেষণা সংস্থা ‘পিউ (Pew)’-এর তথ্যও বিষয়টি স্পষ্ট করে। যুক্তরাষ্ট্রে এমন বিষমকামী বিবাহের হার, যেখানে নারী পুরুষের চেয়ে অন্তত তিন বছর বড়, ২০০০ সাল থেকে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।
অর্থাৎ পর্দার গল্পে কমবয়সী পুরুষ সঙ্গী অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের চেয়ে নারীর আত্মোপলব্ধি ও পেশাগত সাফল্যের অনুঘটক হিসেবেই বেশি কাজ করেন।
‘আই ওয়ান্ট ইওর সেক্স’-এ এরিকা এলিয়টকে নিয়ে বানানো ব্যক্তিগত যৌন ভিডিওগুলোকে শিল্পকর্মে পরিণত করেন এবং নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতে তাকে একটি স্টান্টে জড়িয়ে ফেলেন।
অন্যদিকে ‘ভ্লাদিমির’-এর অধ্যাপক শেষ পর্যন্ত তার আকর্ষণের কেন্দ্রের তরুণ পুরুষটির সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর পর বুঝতে পারেন, আসলে যৌনতাই মূল বিষয় ছিল না। মূল বিষয় ছিল আকাঙ্ক্ষা অনুভব করার সেই শক্তি। সেটি তাকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল ও তার নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, সেই অনুভূতিই তাকে নতুন কিছু সৃষ্টির শক্তি দিয়েছে।
অর্থাৎ হলিউডের নতুন এই গল্পে কমবয়সী পুরুষরা হয়তো সবসময় শেষ গন্তব্য নন; অনেক ক্ষেত্রে তারা বয়সে বড় নারীদের জীবনে পরিবর্তন, আত্মবিশ্বাস ও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার অনুঘটক।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট