আরও ৪২ ঋণখেলাপির পাচার করা অর্থ উদ্ধারে তৎপরতা শুরু

আরও ৪২ শীর্ষ ঋণখেলাপির পাচার করা সম্পদ উদ্ধারের তৎপরতা শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১ প্রতিষ্ঠানের পর এসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে তাদের গোপন সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। এজন্য বিশ্বখ্যাত ৮টি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।

এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে রোববার (৯ আগস্ট) বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐ বৈঠকে বিভিন্ন ব্যাংকের এমডিরা উপস্থিত ছিলেন। মূলত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিংগাপুর ও মালয়েশিয়াসহ ১২টি দেশকে প্রধান লক্ষ্য করে পাচারের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। ‘নো উইন, নো পে’ নীতিতে সম্পদ পুনরুদ্ধারের এই কার্যক্রমে কোনো ব্যাংককে অগ্রিম অর্থ দিতে হবে না। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে সম্পদ অনুসন্ধান করবে। উদ্ধার হওয়া সম্পদের একটি অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে তাদের দিতে হবে।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শীর্ষ ১১টি গ্রুপের ব্যাংক লুট, অর্থপাচার, কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন অনিয়ম-জালিয়াতি খুঁজতে যৌথ তদন্ত দল গঠন করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং আলোচিত ১০টি শিল্প গ্রুপের দেশে ও বিদেশে থাকা মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এবার দ্বিতীয় দফায় ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে পাচার করা সম্পদ খুঁজে বের করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৮টি বড় বিদেশি সংস্থাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হলো- গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস। 

এদিকে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে এই আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন এবং এর আর্থিক পরিমাণ শনাক্তের কাজ করছে। সম্পদ চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী, আইনি প্রক্রিয়ায় প্রথমে তা ফ্রিজ বা জব্দ করার ব্যবস্থা করা হবে। পরে আদালতের নির্দেশে সেসব সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন পাচার করা জাতীয় সম্পদ উদ্ধার হবে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের অনাদায়ী বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণও আদায় সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন, তাদের মধ্যে কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কিছু ঋণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঋণগ্রহীতাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়টি দুটি আলাদা প্রক্রিয়া। ব্যাংকের হিসাবে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করলে সেটি খেলাপি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। ব্যাংক প্রচলিত নিয়মে ঐ ঋণ আদায়ের চেষ্টা করবে। আর যদি দেখা যায়, ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তাহলে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, দুটি প্রক্রিয়া আলাদা হলেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একই— খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় করা এবং বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অথবা ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম দফায় ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করেছে, যাদের মাধ্যমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি দুই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।