রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

আল্লাহর কাছে দোয়া গরি সাম্মর বার যেন অনরা নিজর করি আগামী বার যেন আপনারা নিজের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে পারেন)। ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে এইভাবেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তদানীন্তন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। সে সময়ে তার সঙ্গে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেসও ছিলেন। ড. ইউনূসের এই আশাবাদের পর প্রায় দেড় বছর পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে দুটো ঈদও চলে গেছে। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফেরত যায়নি। এই অবস্থাতেই গত ৩০ জুলাই হঠাৎ করেই দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. আনোয়ার ইব্রাহিমের বরাত দিয়ে এক খবর প্রকাশিত হয় যে, বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার। স্বাভাবিকভাবেই এই খবরে দেশের মানুষের মনে একরাশ প্রত্যাশা ঝিলিক দিয়ে গেল—সত্যিই বুঝি এবার কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

কিন্তু খবরটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যাশার আগুনে পানি ঢেলে দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়ে দিলেন, এই বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। তার পর থেকে স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে একরকমের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন—হঠাৎ করে মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বললেন কেন! পরে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত ২৯ জুলাই নেগেরি সেম্বিলানে স্থানীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময় এক জনসভায় তার দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে বলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর মিয়ানমার মালয়েশিয়ায় থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরো জানান যে বাংলাদেশ থেকেও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। বোঝা যায়, নির্বাচন এলে সাধারণভাবে রাজনীতিকরা যা করে থাকেন, কোনো কথার মধ্যে রং লাগাতে গিয়ে মাঝেমধ্যে একটু বেশিই লাগিয়ে ফেলেন । ড. ইব্রাহিমও তা-ই করেছেন। মালয়েশিয়ার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন ।

এ কথা সবাই জানেন, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিষয়ে আলাপ- আলোচনা চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন অধরাই হয়ে আছে। এক পা এগোয় তো দুই পা পেছানোর মতো অবস্থা। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে, বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসন শুরুর দুটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়, কারণ রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা ছাড়া ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় একটি পাইলট প্রকল্পের কথাও শোনা গিয়েছিল, যেখানে অল্প কিছু পরিবারকে ফেরানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়, সেটাও বাস্তবায়িত হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক বার মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও চীন-মধ্যস্থতায় ত্রিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে, তালিকা বিনিময় হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায় ফিরে যায়নি।
এদিকে গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাবনতিশীল রাখাইন পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আরো জটিল করে তুলছে। আরাকান আর্মি এখন বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এলাকাসহ উত্তর রাখাইনের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ, মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় জান্তা সরকার নিজেই এখন রাখাইনের অনেকাংশে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখে না। তাই তারা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা তাদের কতটা আছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এই অবস্থায় শরণার্থী প্রত্যাবাসন যে আদৌ উপযোগী নয়, তা তো বলাই বাহুল্য ।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিশ্বের চার বৃহৎ শক্তির কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন। তাদের কারো কাছেই বিষয়টি আদৌ মানবিকতার নয়, বরং স্বার্থের । এই চার শক্তি হলো চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত । এই শক্তি চতুষ্টয়ের একটির স্বার্থের সঙ্গে আরেকটির স্বার্থের কোনো মিল নেই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক । প্রথমেই আসে চীনের কথা। রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন হলো সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়। তাদের কাছে রাখাইন বা রোহিঙ্গা সমস্যা নিছক মানবিক ইস্যু নয়, এটা তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটা কৌশলগত কেন্দ্ৰবিন্দু। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের অংশ হিসেবে রাখাইনে থাকা কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং তেল-গ্যাস পাইপলাইন, যা চীনকে মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারত মহাসাগরে সরাসরি সংযোগ দেবে। এর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ চীনের জন্য অধিকতর জরুরি। এজন্য রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের ওপর টেকসই চাপ প্রয়োগ করার আগ্রহ তাদের নেই, বরং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তাদের অবস্থান প্রায়ই মিয়ানমারকে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ থেকে রক্ষা করেছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বরাবরই অস্পষ্ট। বিশেষ করে, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে মিয়ানমার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিয়ানমারে 'জাতীয় জরুরি অবস্থা' আরো এক বছরের জন্য বাড়িয়েছেন ঠিকই, বাস্তবে মার্কিন, ইইউ, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মিয়ানমার চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক আরো গভীর করছে। এতে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। এসব কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় নিচের দিকে, বরং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও মাদক পাচারের মতো ইস্যুতেই তাদের সীমিত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে, রাশিয়া মিয়ানমার জান্তার প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কূটনীতিতে তাদের ভূমিকা প্রায় শূন্য, কিন্তু জান্তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে তারা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। চীনের রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্রসজ্জিত করার ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে অনেক বড়। সম্প্রতি রাশিয়া ও মিয়ানমার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তিতে সই করেছে, যা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এই চুক্তির বলে রাশিয়া মিয়ানমারে অস্ত্র ও হেলিকপটার সরবরাহ করছে বলে জানা যায়। যার একটা বড় অংশ রাখাইনসহ বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। 

অর্থাৎ, রাশিয়া প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে কোনো ভূমিকা না রাখলেও, রাখাইনে যে সহিংসতা প্রত্যাবাসনকে অসম্ভব করে তুলেছে, তাতে পরোক্ষভাবে তাদের অবদান রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী ভারত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেয়েও তাদের সংযোগ প্রকল্প বাঁচাতে বেশি ব্যস্ত। রাশিয়ার মতো তারাও মানবাধিকার প্রশ্নে নীরব। ভারতের অবস্থান নির্ধারিত হয় মূলত একটা প্রকল্প দিয়ে, কালাদান মালটি-মোডাল ট্রানজিট প্রজেক্ট, যা ভারতের বিচ্ছিন্ন উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে রাখাইন রাজ্যের সিটওয়ে বন্দর হয়ে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে তৈরি। রাখাইনের অনেকটাই এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায়, ভারত এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ প্রকল্প রক্ষার জন্য সরাসরি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বলে বিভিন্ন সূত্রের খবর। অন্যদিকে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী মোকাবিলায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সহযোগিতার ওপর অনেকটুকুই নির্ভরশীল ভারত। এসব কারণে ভারত কখনোই প্রকাশ্যে জান্তার সমালোচনা করে না। এমনকি ঢাকার বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও, ভারত মিয়ানমারকে প্রত্যাবাসন দ্রুততর করতে জনসমক্ষে চাপ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

এসব কারণে বাংলাদেশ বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রত্যাবাসনের কথা তুললেও, কোনো পরাশক্তিই মিয়ানমারের ওপর প্রকৃত অর্থে সিদ্ধান্তমূলক চাপ প্রয়োগ করে না। কারণ, প্রত্যেকের নিজের হিসাব-নিকাশ ভিন্ন। আর সেই হিসাবে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কারো জন্যই অগ্রাধিকার নয়। ফলে বাংলাদেশের আবেদন-নিবেদন কারো কানে পৌঁছায় না। যতদিন পর্যন্ত এই চার বৃহৎ শক্তিকে এক টেবিলে আনা না যাবে, ততদিন বাংলাদেশের ঘাড় থেকে রোহিঙ্গা বোঝা নামানোর কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না । কিন্তু, কথায় বলে, 'নয় মণ ঘিও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না”। দেখার বিষয় বাংলাদেশ সেই ঘিয়ের ব্যবস্থা করতে পারে কি না!

লেখক: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক