দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতে প্রশাসনিক নেতৃত্বের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জুলাই ২০২৬-এর তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, অনুমোদিত ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯টিতে নিয়মিত উপাচার্য (ভিসি) নেই। একই সময়ে ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) এবং ৪৭টিতে কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার) পদ শূন্য।
অর্থাৎ অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেই নিয়মিত ভিসি নিয়োগের ঘাটতি ছিল। আর প্রো-ভিসি পদে শূন্যতার চিত্র আরও বিস্তৃত। তবে এটি ১০ আগস্ট ২০২৬-এর লাইভ চিত্র নয়; জুলাই ২০২৬-এর ইউজিসি-ভিত্তিক একটি সময়চিত্র। পরবর্তী সময়ে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বা প্রশাসনিক পরিবর্তন হয়ে থাকলে বর্তমান অবস্থার সঙ্গে ওই তালিকার পার্থক্য হতে পারে।
সমস্যাটি শুধু একটি পদ খালি থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দীর্ঘদিন এসব পদ শূন্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে ভিসি না থাকা মানেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম অবৈধ বা বন্ধ—এমন সিদ্ধান্তও সরাসরি টানা যায় না। কোথাও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারেন; আবার কোথাও নিয়োগ প্রক্রিয়াও চলতে পারে।
ভিসিহীন ৩৯ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জুলাই ২০২৬-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপাচার্য (ভিসি) নেই। ৩ জুলাই প্রকাশিত ওই তালিকায় ১১৬টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে ভিসি পদ শূন্য থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
ইউজিসির তালিকায় ভিসিহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো—ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সাউদার্ণ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি (খুলনা), ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আর.পি. সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (সৈয়দপুর), বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (কাদিরাবাদ), বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (কুমিল্লা), কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (খুলনা), রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া), রূপায়ণ এ.কে.এম. শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা খানবাহাদুর আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ডাঃ মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (খুলনা), লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়, জাস্টিস আবুজাফর সিদ্দিকী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, কুইন্স ইউনিভার্সিটি এবং আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি।
তালিকায় রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর মতো পরিচিত প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তবে ইউজিসির এই তালিকাটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যচিত্র। ফলে তালিকা প্রকাশের পর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ হয়ে থাকলে সেটিকে ১০ আগস্টের বর্তমান ভিসিহীন প্রতিষ্ঠানের তালিকা হিসেবে দেখানো তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (CUST)। ইউজিসির তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নাম থাকলেও ২ জুলাই ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক ড. মো. আমানউল্ল্যাহকে ভিসি এবং মেজর জেনারেল সাহেদুল ইসলামকে ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে CUST-কে ভিসিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রাখা সমীচীন নয়।
এ কারণে ৩ জুলাই প্রকাশিত ইউজিসির তালিকাকে ১০ আগস্ট ২০২৬-এর বর্তমান চিত্র হিসেবে না দেখিয়ে ‘জুলাই ২০২৬-এর ইউজিসি হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করাই নিরাপদ। বিশেষ করে তালিকা প্রকাশের পর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ হয়ে থাকলে সেটি প্রতিবেদনে আলাদাভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
ভিসির পাশাপাশি প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার পদেও বড় শূন্যতা রয়েছে। ইউজিসির ওই তথ্যচিত্রে দেখা যায়, ১১৬টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৬টিতে প্রো-ভিসি এবং ৪৭টিতে ট্রেজারার পদ শূন্য ছিল।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন নিয়োগ না থাকলে একাডেমিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লাল-তারকা সতর্কতায় আট বিশ্ববিদ্যালয়
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে ইউজিসির ‘লাল-তারকা’ ব্যবস্থা রয়েছে। এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণের সিল নয়; বরং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কবার্তা। ইউজিসি ২০২১ সালে জানিয়েছিল, অনুমোদনহীন প্রোগ্রাম বা কোর্স পরিচালনা, অননুমোদিত ভবন বা ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম, ছয় মাসের বেশি সময় ভিসি বা ট্রেজারার না থাকা, অনুমোদিত আসনের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং ট্রাস্টি বোর্ডের মালিকানা বিরোধের মতো কারণে লাল-তারকা দেওয়া হতে পারে।
প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এক, দুই ও তিন তারকা শ্রেণিতে থাকা আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এক তারকা তালিকায় রয়েছে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। দুই তারকা তালিকায় রয়েছে কুইন্স ইউনিভার্সিটি ও সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (CUST)। আর তিন তারকার তালিকায় রয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা এবং আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি।
তবে CUST-এর ক্ষেত্রে সময়ের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটিকে দুই তারকার পূর্ববর্তী তালিকায় দেখানো হলেও পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং লাল-তারকা প্রত্যাহারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে CUST-কে ‘বর্তমানে দুই তারকার প্রাপ্ত’ না বলে ‘পূর্ববর্তী দুই-তারকা তালিকাভুক্ত’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করাই তথ্যগতভাবে নিরাপদ।
চার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ
ইউজিসি-ভিত্তিক জুলাই ২০২৬-এর তথ্যচিত্রে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকা চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি এবং কুইন্স ইউনিভার্সিটি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঝুঁকির সবচেয়ে বড় অংশটি শিক্ষার্থীদের। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীর সময়, অর্থ ও শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। তাই ভর্তি নেওয়ার আগে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা বিজ্ঞাপন নয়—ইউজিসির সর্বশেষ অনুমোদন, নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম, আসনসংখ্যা, ক্যাম্পাস এবং কোনো ভর্তি নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কতা রয়েছে কি না—এসব যাচাই করা জরুরি।
স্থায়ী ক্যাম্পাস ও অনুমোদিত আসন নিয়েও প্রশ্ন
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে স্থায়ী ক্যাম্পাস একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক শর্ত। একই সঙ্গে অনুমোদিত আসনসংখ্যার বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি এবং অনুমোদনহীন ক্যাম্পাস বা প্রোগ্রাম পরিচালনার বিষয়েও ইউজিসি বহুবার সতর্ক করেছে। ২০২১ সালের ইউজিসি সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সনদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল।
তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে—এমন অভিযোগ থাকলেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সনদ অবৈধ, এমন সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া যায় না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রাম, অনুমোদিত আসন, ভর্তি সময়কাল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
ভর্তি স্থগিত দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে
২০২৬ সালের শুরুতে ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি এবং গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত রাখার তথ্যও সামনে এসেছে।
তবে ভর্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ‘সনদ জালিয়াতি প্রমাণিত’ বা কোনো ফৌজদারি অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নোটিশে যে কারণ, নির্দেশনা ও সময়সীমা উল্লেখ রয়েছে, সংবাদে সেটিই তুলে ধরা উচিত।
ভিসি নেই—তাই অনিয়ম, এমন সমীকরণ নয়
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা এখানেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ভিসি নেই—এটি প্রশাসনিক ঘাটতির তথ্য; এটি নিজে দুর্নীতি, তহবিল তছরুপ বা সনদ বাণিজ্যের প্রমাণ নয়।
একইভাবে লাল-তারকা পাওয়াও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য নয়। তাই ভিসিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকার সঙ্গে আলাদাভাবে প্রমাণিত নয় এমন ‘তহবিল তছরুপ’, ‘অর্থ পাচার’, ‘সনদ বিক্রি’ কিংবা ‘টাকা দিয়ে GPA’ দেওয়ার অভিযোগ জুড়ে দেওয়া সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ করতে হলে অডিট রিপোর্ট, ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের নথি, মামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃত নথি থাকা প্রয়োজন।
দরকার বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ‘স্ট্যাটাস রিপোর্ট’
বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতের এই প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে ইউজিসির কাছে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে নিয়মিত ও সহজবোধ্য বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যাটাস রিপোর্ট প্রকাশ।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের পাশে যদি নিয়মিত হালনাগাদ করে উল্লেখ থাকে—ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার কে; স্থায়ী ক্যাম্পাসের অবস্থা কী; কোন প্রোগ্রাম অনুমোদিত; আসনসংখ্যা কত; কোনো লাল-তারকা আছে কি না; ভর্তি স্থগিত কি না—তাহলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হবে। কারণ উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক বাস্তবতা স্থির নয়। জুলাইয়ের একটি তালিকা আগস্টে এসে বদলে যেতে পারে। CUST-এর ঘটনাই তার একটি উদাহরণ। আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগ হলে শুধু পুরোনো তালিকার ভিত্তিতে তাকে ‘ভিসিহীন’ বলা তথ্যগতভাবে ভুল হতে পারে।
শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় না বহন করে
সব মিলিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের সংকটকে শুধু ‘৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নেই’—এই একটি পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৯৬টি প্রতিষ্ঠানে প্রো-ভিসি এবং ৪৭টিতে ট্রেজারার পদ শূন্য থাকার তথ্য, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লাল-তারকা সতর্কতা, স্থায়ী ক্যাম্পাস নিয়ে প্রশ্ন, অনুমোদিত আসনের বাইরে ভর্তি এবং কোথাও কোথাও শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ বা ভর্তি স্থগিত থাকার মতো বিষয়।
তবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা এক নয়। কোনোটি শুধু প্রশাসনিক শূন্যতায় রয়েছে, কোনোটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আছে, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতা আরও গুরুতর।
তাই এখন প্রয়োজন সময়সীমাবদ্ধ ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, নিয়মিত একাডেমিক ও আর্থিক অডিট, অনুমোদিত আসন ও প্রোগ্রাম কঠোরভাবে অনুসরণ, স্থায়ী ক্যাম্পাসের শর্ত বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ট্রাস্টি বোর্ডের বিরোধ কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে জটিলতার খেসারত যেন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীকে দিতে না হয়। উচ্চশিক্ষার বাজারে সবচেয়ে বড় স্বার্থের জায়গা প্রতিষ্ঠান নয়, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।