নলডাঙ্গা কি শুধুই জমিদারি—ইতিহাস নতুনভাবে পড়ছেন ইমদাদুল হক সোহাগ

‘রাজবাড়ি’, ‘জমিদারবাড়ি’ ও ‘এস্টেট’—বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাসে এসব পরিচয় বহুল প্রচলিত। কিন্তু নামের আড়ালে থাকা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে আলোচিত হয়নি। এই অপঠিত পরিসর নিয়েই কাজ করছেন স্বাধীন গবেষক ও নীতিবিশ্লেষক মো. ইমদাদুল হক সোহাগ। তাঁর অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রয়েছে ঐতিহাসিক যশোর অঞ্চলের নলডাঙ্গা এস্টেট ও মহামুদশাহী পরগনা।

মুঘল ও ঔপনিবেশিক বাংলার স্থানীয় শাসনকাঠামো, জমিদারি প্রতিষ্ঠান এবং রাজস্ব প্রশাসন তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্র। প্রচলিত পরিচয়গুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে, সে প্রশ্নও তিনি অনুসন্ধান করছেন।

সোহাগের গবেষণার মূল প্রশ্ন—নলডাঙ্গার মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু ‘জমিদারি’ হিসেবে চিহ্নিত করলে এর সামগ্রিক ভূমিকা কতটা বোঝা যায়?

তাঁর বিশ্লেষণে নলডাঙ্গা স্বাধীন বা সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল না। আবার এটি কেবল রাজস্ব আদায়ের সাধারণ একটি জমিদারিও নয়। এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি একটি প্রশাসনিক বাস্তবতা বোঝাতে তিনি ‘মধ্যবর্তী আঞ্চলিক কর্তৃত্ব’ ধারণাটি ব্যবহার করেছেন।

সোহাগের মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান মুঘল, নবাবি বা পরবর্তী ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থেকেও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রভাব বজায় রাখত। রাজস্ব সংগ্রহ ছিল এর একটি কাজ। এর পাশাপাশি ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা, শিক্ষা, বাজার ব্যবস্থাপনা, জলসম্পদ, যোগাযোগ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও সংশ্লিষ্ট পরিবারের ভূমিকা থাকতে পারত।

নলডাঙ্গা নিয়ে সোহাগের একটি গবেষণাপত্র এসএসআরএনে কর্মপত্র হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর শিরোনাম Reassessing Regional Authority in Mughal Bengal: A Spatial, Legal, and Historiographical Analysis of the Naldanga Estate within Mahmudshahi Pargana। গবেষণাপত্রটির এসএসআরএন অ্যাবস্ট্রাক্ট নম্বর ৬৫৩৯০৩৮।

এতে নলডাঙ্গা এস্টেটের স্থানিক বিন্যাস, আইনগত অবস্থান, ঐতিহাসিক পরিচয় এবং মহামুদশাহী পরগনার সঙ্গে এর সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্বের দাবি না তুলে প্রতিষ্ঠানটিকে বহুমাত্রিক স্থানীয় ক্ষমতার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

পরে গবেষণাটি আরও বিস্তৃত ও পরিমার্জিত করেন সোহাগ। নতুন পাণ্ডুলিপির শিরোনাম Regional Authority and Layered Governance in Mughal and Early Colonial Bengal: A Microhistorical Reassessment of the Naldanga Estate।

পরিমার্জিত পাণ্ডুলিপিতে ‘মধ্যবর্তী আঞ্চলিক কর্তৃত্ব’ ও ‘স্তরভিত্তিক শাসনব্যবস্থা’—এই দুটি ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চতর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে থেকেও কোনো ভূসম্পত্তি ও শাসক পরিবার স্থানীয় সমাজে কীভাবে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও প্রতীকী প্রভাব বিস্তার করত, সেটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা রয়েছে এতে।

গবেষণার প্রধান স্থানীয় উৎস হিসেবে সোহাগ ব্যবহার করেছেন ১৯১১ সালে প্রকাশিত অ্যামভিকাচরণ মুখুরজির Naldanga and the Naldanga Raj Family গ্রন্থ। পাশাপাশি ঔপনিবেশিক জেলা প্রতিবেদন এবং মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের কৃষি, রাজস্ব ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন কাজ পর্যালোচনা করেছেন তিনি।

তবে স্থানীয় ইতিহাসগ্রন্থ বা পারিবারিক বিবরণে থাকা সব বক্তব্যকে সরাসরি প্রামাণ্য তথ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। বংশপরম্পরা, উপাধি, ভূমির অধিকার, সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক মর্যাদাসংক্রান্ত দাবি মূল্যায়নে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

পারিবারিক স্মৃতি, স্থানীয় ঐতিহ্য, সমকালীন পর্যবেক্ষণ ও নথিনির্ভর তথ্যকে আলাদাভাবে বিচার করার চেষ্টা রয়েছে তাঁর কাজে। সোহাগ মনে করেন, স্থানীয় ইতিহাসের উৎস মূল্যবান। তবে সেগুলোকে বৃহত্তর সময়, সমাজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হয়।

নলডাঙ্গা এস্টেটের বসতি, রাজবাড়ি, মন্দির, জলাশয়, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দাতব্য উদ্যোগ ও যোগাযোগব্যবস্থাও তাঁর অনুসন্ধানে স্থান পেয়েছে। এসব স্থাপনা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্থানীয় ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি।

সোহাগ বলেন, “শুধু প্রচলিত নাম বা প্রতিষ্ঠিত বর্ণনার ওপর নির্ভর করলে অনেক সময় কোনো স্থানের প্রকৃত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক গুরুত্ব আড়ালে থেকে যায়। একটি স্থাপনাকে ‘রাজবাড়ি’ বলা হচ্ছে, অথচ একই ধরনের বা তুলনামূলক গুরুত্বের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু ‘জমিদারবাড়ি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।”

উদাহরণ হিসেবে নাটোর ও নলডাঙ্গার প্রচলিত পরিচয়ের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

সোহাগ বলেন, “নাটোরকে সাধারণভাবে রাজবাড়ি বলা হলেও নলডাঙ্গাকে প্রায়ই জমিদারবাড়ি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই শ্রেণিবিভাগ কোন ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। দলিল, রাজস্ব-সম্পর্ক, স্থানীয় শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার আলোকে দেখতে হবে—প্রচলিত পরিচয়টি ইতিহাসের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।”

তবে নলডাঙ্গাকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। এই বিষয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন সোহাগ।

তিনি বলেন, “আমি কোনো স্থানকে অতিরঞ্জিতভাবে রাজ্য বা স্বাধীন শাসনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই না। প্রচলিত পরিচয়ের আড়ালে থাকা ঐতিহাসিক জটিলতা অনুসন্ধান করাই আমার লক্ষ্য।”

সোহাগের মতে, ‘রাজবাড়ি’, ‘জমিদারবাড়ি’, ‘এস্টেট’ কিংবা ‘আঞ্চলিক কর্তৃত্ব’—এসব পরিভাষা কেবল লোকমুখে প্রচলিত ধারণা বা পরবর্তী প্রশাসনিক অভ্যাসের ভিত্তিতে ব্যবহার করা উচিত নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব-সম্পর্ক, স্থানীয় প্রশাসনে ভূমিকা, স্থাপত্য, পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক প্রভাব একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তবেই তার অবস্থান সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব।

মো. ইমদাদুল হক সোহাগ বর্তমানে স্বাধীনভাবে গবেষণা ও নীতিবিশ্লেষণমূলক কাজ করছেন। ভূরাজনীতি, সমুদ্র শাসন, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত পরিস্থিতি, পানি ও জলবায়ু নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগ নিয়েও তিনি লেখেন। তাঁর ওআরসিআইডি পরিচিতি নম্বর 0009-0000-9580-536X।