আখেরি চাহার শোম্বার তাৎপর্য

ইসলামি ঐতিহ্যে কিছু দিন ও সময় মুসলিম সমাজে বিশেষ স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ‘আখেরি চাহার শোম্বা” তেমনই একটি প্রসিদ্ধ উপলক্ষ্য। ‘আখেরি চাহার শোম্বা' বলতে সাধারণত হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝানো হয়। মুসলমানদের কাছে দিনটি বিশেষভাবে পরিচিত এবং রসুলুল্লাহ (স.)-এর শেষ জীবনের অসুস্থতার একটি পর্যায়ের স্মৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

রসুলুল্লাহ (স.)-এর শেষ অসুস্থতার অন্যতম বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে। তিনি বলেন— 'রসুলুল্লাহ (স.) যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তার রোগ তীব্র হলো, তখন তিনি তার স্ত্রীদের কাছে অনুমতি চাইলেন, যেন তাকে আমার ঘরে সেবা-শুশ্রূষা করা হয়। তারা তাকে অনুমতি দিলেন। এরপর তিনি হজরত আয়েশা (রা) -এর ঘরে অবস্থান করলেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—রসুলুল্লাহ (স.)- এর অসুস্থতা যখন তীব্র হলো, তখন তিনি বললেন, এমন সাতটি মশক থেকে আমার ওপর পানি ঢালো, যেগুলোর মুখের বাঁধন খোলা হয়নি; সম্ভবত আমি মানুষের কাছে কিছু নসিহত করতে পারব। এরপর তাকে একটি পাত্রে বসানো হলো এবং তার ওপর সাত মশক পানি ঢালা হলো। তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করার পর মানুষের কাছে ফিরে গেলেন (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৪৪৪২)।'

নবিজিকে পূর্ণ সুস্থ দেখে সাহাবায়ে কেরাম খুবই আনন্দিত হন, প্রত্যেকে নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সাদকা করেন। হজরত আবু বকর (রা.) তৎকালীন সময়ে ৫ হাজার দিনার গরিবদের দান করে দেন। হজরত উমর ফারুক (রা.) ৭ হাজার দিনার সাদকাহ্ করেন। হজরত ওসমান গনি (রা.) দান করেছিলেন ১০ হাজার দিনার। হজরত আলি (রা.) দান করেন ৩ হাজার দিনার। সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) এই খুশির সংবাদে ১০০ উট আল্লাহর রাস্তায় দান করেন। এ থেকে আমরা শিক্ষা পেতে পারি, নবির প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা কেমন ছিল। এককথায় বলা যায়, নবি (স.)-এর প্রতি তাদের ভালোবাসা ছিল নিখাদ ও অতুলনীয়। তারা নবিজির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পর্যন্ত দ্বিধা করেননি।

রসুলুল্লাহ (স.)-এর অসুস্থতার অন্যতম কারণ তাকে জাদু করা। নবুওয়াতের প্রথম যুগ নিজ মাতৃভূমি মক্কায় তাকে নির্মম নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে। হিজরতে পর মদিনায়ও তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেওয়া হয়নি। তাকে ইহুদি-মোনাফেকদের নতুন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। মক্কার কাফেররা মদিনার ইহুদি মোনাফেকদের যোগসাজশে নবিজিকে মদিনাতেও আক্রমণ করেছে। তারা তার প্রাণনাশের চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। মদিনায় ইহুদি একটি চক্র লবিদ ইবনে আসমকে বলল, 'তুমি তো জাদুবিদ্যায় খুব পারদর্শী; তাই মুসলমানদের নবি মুহাম্মদকে শেষ করার জন্য তোমাকে দায়িত্ব নিতে হবে। লবিদ কৌশলে নবি (স.)-এর এক ইহুদি গোলানের মাধ্যমে তার ব্যবহৃত চিরুনি ও চুল মোবারক সংগ্রহ করে তাতে জাদু করল। একটি সুতায় কুফরি মন্তর পড়ে ১১টি গিরা দিয়ে মদিনায় ‘জারওয়ান’ নামক কূপে পাথরচাপা দিয়ে রেখে দিল। নবিজি দিনদিন শারীরিকভাবে অবসন্ন হয়ে পড়লেন। এক রাতে দুই জন ফেরেশতা এসে তাকে তার শারীরিক এই অবনতির কারণ জানিয়ে দিলেন। একজন মাথার কাছে, অন্যজন পায়ের কাছে বসে পরস্পর কথোপকথন করলেন। পায়ের কাছের ফেরেশতা বলল – নবিজির কী হয়েছে? মাথার কাছের ফেরেশতা বলল—তাকে জাদু করা হয়েছে। জাদু কে করেছে—কোথায় জাদু—সবকিছু সবিস্তারে নবিজিকে জানিয়ে দেওয়া হলো। সকালে নবি পাক (স.) সাহাবিদের নিয়ে সেই জাদুর বস্তুগুলো উদ্ধার করলেন। অতঃপর হজরত জিবরাইল (আ.) সুরা ফালাক ও সুরা নাস নিয়ে নবিজির কাছে আগমন করেন। এ দুটি সুরার আয়াতসংখ্যা হচ্ছে ১১। জিবরাইল (আ.) এই সুরা দুটি পাঠ করলেন। প্রতিটি আয়াত পাঠের পরই একেকটি শিরা খুলতে লাগল। ফলে আল্লাহর নবি আরোগ্য লাভ করলেন। এরপর তিনি গোসল করলেন। আমাদের জীবনে শিক্ষা হলো—জিন ও মানবের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর বদনজর বা জাদু নিক্ষেপ করা হতে পারে। সেজন্য সুরা ফালাক এবং নাসের আমল আমরা নিজেরা করব, আমাদের সন্তানদের সুরক্ষিত রাখতে তাদের ওপর প্রয়োগ করব।

পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই তা হলো- রসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ, তার সব আচার-আচরণ, প্রতিটি পদক্ষেপ তথা সমগ্র জীবনই সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে অনুকরণীয় অনুসরণীয়; যা কুরআনুল কারিমে নানা আঙ্গিকে ব্যক্ত হয়েছে। নবিজির সুন্নাহ অনুসরণের পাশাপাশি আমরা তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসব, তার শেখানো পদ্ধতি অনুসারে জীবন গড়ব। যেহেতু নবিজির রোগমুক্তির দিনটি ছিল সমগ্র জগতের জন্য খুশির দিন, তাই এদিন আল্লাহর কাছে আমাদের বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করব, তার প্রতি বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করব। আল্লাহ আমাদেরকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার হাবিবের অনুসরণ-অনুকরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

লেখক: আজিমপুর দায়রা শরিফের বর্তমান সাজ্জাদানশিন পির ও মুতাওয়াল্লি।