দেশ জুড়ে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট কাটতে আরো অন্তত এক সপ্তাহ লাগতে পারে। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল গত তিন সপ্তাহ ধরে। পেট্রোবাংলার টার্মিনালটি পুরোদমে চালু হওয়ার আগেই সামিটের টার্মিনালটি থেকেও গত চার দিন ধরে সরবরাহ কমিয়ে দিতে হচ্ছিল।
এর মধ্যেই গতকাল বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালটি থেকেও গ্যাস সরবরাহ গতকাল বন্ধ করা হয়েছে। ফলে শিল্পে ও বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ আরো কমতে যাচ্ছে। যার ফলে বিদ্যুতের লোডশেডিং বৃদ্ধি এবং আবাসিক ও শিল্পসহ সব শ্রেণির গ্যাসের গ্রাহকদের ভোগান্তি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বড় কয়েকটি কেন্দ্রে উত্পাদন কমেছে এবং ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানিতেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলা ও পিডিবির সূত্রগুলো বলছে, এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা দূর, কয়লা ও তেল আমদানি বৃদ্ধি করে এ জ্বালানিগুলো থেকে উত্পাদন বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপগুলো পরিণতির দিকে নেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলা ও সামিটের টার্মিনাল থেকে পুরোদমে গ্যাস পেতে আরো এক সপ্তাহ লাগবে। এটি হলেও সংকট অনেকটা কেটে যাবে।
জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকাল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। উত্পাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার রাত ১২টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। সোমবার সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন রবিবার রাত ১টায় তা ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠেছিল। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এবার তা ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠছে। গ্যাস না পেয়ে শিল্পকারখানা গ্রিডের বিদ্যুত্ ব্যবহার করছে। বাসাবাড়িতেও বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, সংকটের বড় কারণ এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়া। মহেশখালীর সামিটের টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। সেখান থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। পেট্রোবাংলার টার্মিনালও বয়লার সমস্যায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। সেখান থেকে মিলছে ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনালটি ৫০-৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। দুই টার্মিনাল মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহ এখন দৈনিক প্রায় ৪১ কোটি ঘনফুট। সামিটের নতুন কার্গো ১৫ আগস্ট আসার কথা। এরপর পেট্রোবাংলার টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় কাজ করতে হবে। ফলে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
গ্যাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে বিদ্যুত্ উত্পাদনে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট হলেও এখন উত্পাদন হচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুেকন্দ্রে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও পাওয়া যায় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট; চলমান সংকটে তা একপর্যায়ে ৭০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছিল।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও উত্পাদন কমেছে। পটুয়াখালীর নোরিনকো কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট কম এবং পায়রা থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুত্ পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের আদানি পাওয়ার থেকেও আমদানি ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট কমে ৮০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াটে নেমেছে। ১৫ আগস্টের পর সামিটের এলএনজি সরবরাহ বাড়লে পরিস্থিতির প্রথম উন্নতি দেখা যেতে পারে।
এরপর পেট্রোবাংলার টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে গ্যাসভিত্তিক উত্পাদন বাড়বে। তবে আবহাওয়া, এলএনজি খালাস ও মেরামত পরিকল্পনা অনুযায়ী না হলে সংকট আরো দীর্ঘ হতে পারে। জ্বালানির এই সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুত্ উত্পাদন। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে না পারায় গত প্রায় ১০ দিন ধরে ঢাকার বাইরে তীব্র লোডশেডিং করা হচ্ছে। পরিস্থিতির চাপে এখন ঢাকায়ও লোডশেডিং শুরু হয়েছে।