আল্লাহ তাআলা এ মর্মে নির্দেশ দেন যে- হে ঈমানদারগণ! জুমআর দিন যখন তোমাদের নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা দ্রুতগতিতে আল্লাহর স্মরণে (মসজিদে) ধাবিত হও আর বেচা-কেনা (ওই সময় দুনিয়ার সব কাজ) ছেড়ে দাও। তোমরা যদি জ্ঞানী হওয়া তবে এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। অতপর যখন নামাজ শেষ হয়ে যাবে তখন (সঙ্গে সঙ্গে) জমিনে (নিজ নিজ কাজে অংশগ্রহণে) ছড়িয়ে পড়। আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণে লেগে যাও। আর আল্লাহকে বেশি বেশি করে স্মরণ করতে থাক; যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা জুমআ : আয়াত ৯-১০)
ইসলামি সংস্কৃতিতে জুমার দিনকে 'সাপ্তাহিক ঈদের দিন' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এটি শুধু একটি সাধারণ ছুটি নয়, বরং আত্মিক জাগরণ, পাপমুক্তি এবং মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত হাসিলের এক অপার সুযোগ। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছু বিশেষ সুন্নত ও আমলের মাধ্যমে এই দিনকে আমলে পূর্ণ করে তোলা সম্ভব। জুমার দিনের ১০টি বিশেষ করণীয় আলোচনা করা হলো।
১. নখ কাটা ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতা
জুমার দিনের প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত শারীরিক পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে। গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা ও পরিপাটি হওয়া সুন্নতি অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশিত মানব স্বভাবের (ফিতরাত) পরিচ্ছন্নতার নির্দেশ মেনে নিজেকে ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করা উত্তম। (সহিহ বুখারি: ৫৮৮৯)
জুমার দিনে নখ কেটে ও শরীর পরিচ্ছন্ন করে ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা উত্তম সুন্নত।
২. ভালোভাবে গোসল করা
জুমার জামাতে বহু মানুষের সমাগম ঘটে, তাই শরীরকে সতেজ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখতে গোসল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। নবীজি (সা.) জুমার নামাজে আসার পূর্বে গোসল করার জোর তাগিদ দিয়েছেন। নবীজি বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ জুমার নামাজে আসার ইচ্ছা করে, সে যেন গোসল করে নেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৪৪)
ভালোভাবে গোসল করা শুধু দৈহিক পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সঙ্গে মনকেও ইবাদতের জন্য প্রফুল্ল করে তোলে।
৩. পরিষ্কার পোশাক, মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহার
সাপ্তাহিক উৎসবের দিন হিসেবে তুলনামূলক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বা উত্তম পোশাক পরিধান করা, মিসওয়াক করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত। এগুলো প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে গোসল করা, মিসওয়াক করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর কর্তব্য। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮০)
৪. সুরা কাহফ পাঠ করা
জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠের বিশেষ বরকত রয়েছে। হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সুরা কাহফ তিলওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে অপর জুমা পর্যন্ত এক বিশেষ আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ফিতনা থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে। (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩৩৯২)
৫. দরুদ পাঠ করা
জুমার দিনে দরুদ পাঠের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মহানবী বলেছেন, তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে নবী আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এই দিনেই তার ওফাত হয়েছিল। তাই এই দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো; কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
৬. মসজিদে আগেভাগে যাওয়া
সকাল সকাল মসজিদে যাওয়া অনেক বড় সওয়াবের কাজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় অবস্থান করেন এবং আগমনকারীদের নাম পর্যায়ক্রমে লিখতে থাকেন। যে ব্যক্তি সবার আগে আসে, সে একটি উট কুরবানি করার সওয়াব পায়। এরপর যে আসে সে একটি গাভী, তারপর দুম্বা, তারপর মুরগি এবং সবশেষে একটি ডিম দান করার সওয়াব পায়। আর যখন ইমাম খুতবার জন্য বের হন, তখন ফেরেশতারা তাঁদের খাতা বন্ধ করে খুতবা শুনতে বসে যান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮১)
৭. হেঁটে হেঁটে মসজিদে যাওয়া
সম্ভব হলে যানবাহনের ওপর নির্ভর না করে হেঁটে মসজিদে যাওয়া উত্তম। ঘরে সুন্দরভাবে অজু করে মসজিদে হেঁটে যাওয়ার মাধ্যমে প্রতিটি পদক্ষেপে পাপ ঝরে পড়ে এবং জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। (সহিহ মুসলিম: ৬৬৬)
৮. জুমার খুতবা মন দিয়ে শোনা
খুতবা চলাকালীন সম্পূর্ণ নীরব থেকে তা শ্রবণ করা ওয়াজিব। এ সময় কথা বলা, অন্যকে চুপ করতে বলা বা অন্য কোনো কাজে মশগুল হওয়া অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য হয়, যা জুমার সওয়াব কমিয়ে দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে ইমাম যখন খুতবা দেন, তখন যদি তুমি তোমার পাশের সঙ্গীকে বলো ‘চুপ থাকো’, তবে তুমিও একটি অনর্থক কাজ করলে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)
৯. জুমার নামাজ যথানিয়মে আদায় করা
জুমার দুই রাকাত ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা মুসলিম পুরুষের ওপর আবশ্যক। মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, “হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় বা কাজকর্ম বন্ধ করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে!” (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)
জুমার নামাজ গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করা ইমানের অন্যতম দাবি।
১০. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত খোঁজা
জুমার দিনে এমন একটি সংক্ষিপ্ত সময় রয়েছে, যখন বান্দার যেকোনো কল্যাণকর দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করে নেন। হাদিসের অধিকাংশ বর্ণনানুযায়ী, এই সময়টি হলো আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত বা মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত। তাই এ সময় বেশি বেশি দোয়ায় মগ্ন থাকা উচিত।
মহানবী (সা.) বলেছেন, এই দিনে এমন একটি সময় আছে, কোনো মুসলিম যদি সেই সময় নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে ভালো কিছু চায়, তবে আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দান করেন—এই বলে মহানবী (সা.) হাত দিয়ে নির্দেশ করলেন যে সেই সময়টি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, এই বিশেষ মুহূর্তটি হলো আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত বা মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)
তাই আসরের পর বেশি বেশি দোয়ায় মগ্ন থাকা উচিত।