কথা বলতে বলতে হঠাৎ এমন হয়, খুব পরিচিত একটি শব্দ মনে করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ পর হয়তো নিজে থেকেই মনে পড়ে গেলো। এমন অভিজ্ঞতা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। নাম বা পরিচিত শব্দ যখন কিছুতেই মনে পড়ে না, তখন অনেকেই বলেন - কথাটা পেটে আসছে, কিন্তু ঠিক মুখে আসছে না। কিন্তু এই ঘটনা যদি বারবার ঘটতে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টিকে হালকা ভাবে না নেওয়াই ভালো।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সংবাদ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
হঠাৎ করে নাম ভুলে যাওয়া, পরিচিত শব্দও মাথা থেকে একেবারে উধাও হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার নাম ‘টিপ-অফ-দ্য-টাং’। এটি কোনো নতুন রোগ নয়, বরং স্মৃতিভ্রমেরই একটি অংশ। এর মানে শব্দটি বা নামটি মস্তিষ্ক থেকে মুছে গিয়েছে তা নয়, বরং সেটি মনে করার যে প্রক্রিয়া, সেখানে বাধা তৈরি হচ্ছে। ‘হিপ্পোক্যাম্পাস’ মস্তিষ্কের স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই অংশটির সঙ্গে ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশের সংযোগ থাকে। সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই গোলমাল শুরু হয়।
সাধারণত শব্দটি মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে যায় না। বরং সেই মুহূর্তে স্মৃতিতে থাকা তথ্যটি ঠিকমতো খুঁজে বের করে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়।
মস্তিষ্কে স্মৃতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজে একাধিক অংশ একসঙ্গে কাজ করে। ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশগুলিও সেই তথ্যকে শব্দে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। ফলে কোনও একটি শব্দ মনে করার সময় এই প্রক্রিয়ায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটলে পরিচিত নাম বা শব্দটি জানা থাকা সত্ত্বেও মুখে আনা কঠিন হতে পারে।
ধরা যাক, কোনো নাম বা পরিচিত শব্দ যা আগে শুনেছেন বা জানেন সেটি বলতে যাবেন। তখন স্মৃতি থেকে সেই শব্দটি সংযোগ পথের মাধ্যমে ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশে এসে পৌঁছাবে। স্মৃতির সঙ্কেত ভাষায় রূপান্তরিত হবে। তখন সেটি উচ্চারণ করা যাবে। কিন্তু এই পথটাই যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন নাম বা শব্দটি স্মৃতিতে থেকে গেলেও সেটি ঠিক ভাষায় রূপান্তরিত হবে না। ফলে নামের সঙ্গে জড়িত বিষয়, জায়গা বা ব্যক্তির চেহারা মনে পড়লেও, সেটি ঠিক ভাষায় ব্যাখ্যা করে বলতে পারবেন না।
বিষয়টা কী অস্বাভাবিক?
কথা বলার সময়ে খুব জানা একটি শব্দ বা নাম হঠাৎ মনে না পড়ার সমস্যা অনেকেরই হয়। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যাটি যদি প্রায়ই হতে থাকে, চেনা নাম বা পরিচিত শব্দও বলার ঠিক আগের মুহূর্তে ভুলে যেতে থাকেন, তা হলে সেটি চিন্তার। ক্ষণিকের জন্য স্মৃতিভ্রম অনেকেরই হয়, তবে তা দিনের পর দিন চলতে থাকলে তখন সেটি স্নায়বিক রোগের লক্ষণ হতে পারে।
সব ভুলে যাওয়াই স্মৃতিনাশ নয়
মাঝেমধ্যে নাম বা শব্দ মনে না পড়লেই ডিমেনশিয়া হয়েছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি বা একসঙ্গে অনেক বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার কারণেও এমনটা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝেমধ্যে এ ধরনের ঘটনা কিছুটা বাড়তেও পারে।
তবে ভুলে যাওয়ার ঘটনা যদি ক্রমশ বাড়তে থাকে, তখন সতর্ক হওয়া জরুরি। বিশেষ করে পরিচিত মানুষ, জায়গা, ঠিকানা বা দৈনন্দিন কাজের বিষয় বারবার ভুলে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কেন এমন হয়
‘টিপ অফ দ্য টাং’ সমস্যাটি সাধারণ। কিন্তু এই ভুল সবসময় হতে থাকলে তখন সেটি স্মৃতিনাশের লক্ষণ বলেই ধরে নিতে হবে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অত্যধিক মানসিক চাপ, বিভ্রান্তি, কম ঘুমের কারণে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর সঙ্কেত আদান-প্রদানের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ভুলে যাওয়ার সমস্যা বাড়ে। মাথায় গুরুতর আঘাত, দীর্ঘদিন ধরে মদ্যপানের কারণে সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ হতে পারে।
কখন বিষয়টি উদ্বেগের হতে পারে?
শব্দ খুঁজে পাওয়ার সমস্যা যদি ক্রমশ বাড়তে থাকে, দৈনন্দিন কথাবার্তায় বাধা সৃষ্টি করে বা স্মৃতি ও চিন্তাভাবনার অন্য পরিবর্তনের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, অবসাদ, উদ্বেগ, শ্রবণশক্তির সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ ও দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
কথা বলার সময় শুধু একটি শব্দ মনে না পড়ার পাশাপাশি যদি পরিচিত মানুষকে চিনতে সমস্যা হয়, একই কথা বারবার বলতে হয়, সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখতে অসুবিধা হয়, পরিচিত জায়গায় পথ ভুলে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে কিংবা দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এগুলো কখনও কখনও ডিমেনশিয়া বা অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
এছাড়া মাথায় গুরুতর আঘাত, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মদ্যপান, কিছু ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, থাইরয়েডের সমস্যা বা নির্দিষ্ট ভিটামিনের ঘাটতির সঙ্গেও স্মৃতির সমস্যা সম্পর্কিত হতে পারে। তাই বারবার ভুলে যাওয়ার কারণ নিজে থেকে নির্ধারণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
অর্থাৎ, মাঝে মধ্যে পরিচিত কোনো নাম বা শব্দ মনে না পড়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সমস্যা যদি ঘন ঘন হতে থাকে, বাড়তে থাকে বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তখন সেটিকে বয়সজনিত সাধারণ ভুল বলে এড়িয়ে না গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্মৃতি ভালো রাখতে যা করবেন
পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ স্মৃতিশক্তি ও সামগ্রিক মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে অতিরিক্ত কাজের চাপ কমিয়ে একসঙ্গে অনেক বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে একটি কাজ শেষ করে অন্য কাজে মন দেওয়া উপকারী হতে পারে।