জাহাজভাঙা শিল্প অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কোনো শিল্পের অর্থনৈতিক মূল্য শ্রমিকের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করিতে পারে না। শ্রমিকের মৃত্যু আমাদের দেশে প্রায়শই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। কিছু তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, ক্ষতিপূরণের আশ্বাস আসে, তাহার পর জীবন আবার স্বাভাবিক হইয়া যায়; কিন্তু শ্রমিকের পরিবারের নিকট জীবন আর স্বাভাবিক হয় না।
সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু শুধুই একটি দুর্ঘটনা নহে। ইহা শিল্পনিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি ভয়াবহ ব্যর্থতার প্রশ্ন। সবচাইতে উদ্বেগজনক তথ্যটি হইল, এই কারখানার নিরাপত্তা ঘাটতি দুর্ঘটনার পূর্বেই সরকারি পরিদর্শনে ধরা পড়িয়াছিল।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সেইখানে নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা লইয়া বিভিন্ন অনিয়ম পায়। শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের চাইতে বেশি কাজ করানোর অভিযোগও ছিল। একাধিক নোটিশ এবং কারণ দর্শানোর পরও যথাযথ জবাব না পাওয়ায় জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। সেই মামলার এক মাসের মধ্যেই মৃত্যু ঘটিল ৯ জন শ্রমিকের।
এইখানে প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল-একটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হইল, মামলা করা হইল; কিন্তু তাহার কর্মপরিবেশ নিরাপদ হইয়াছে কি না, তাহা নিশ্চিত করা হইল না কেন? দুর্ঘটনার প্রকৃতিও ভয়াবহ। ‘এমটি রাসি’ নামের ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহন করিত। জাহাজটির একটি অংশ কাটার সময় হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির কথা প্রাথমিক তদন্তে উঠিয়া আসিয়াছে। এক জন শ্রমিক অচেতন হইয়া পড়ার পর তাহাকে উদ্ধার করিতে যাইয়া একের পর এক শ্রমিক বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারীদের সুরক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত রেসকিউ টিম, উপযুক্ত শ্বাসযন্ত্র এবং নির্ধারিত জরুরি পদ্ধতি থাকা অপরিহার্য।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার পূর্বে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা প্রয়োজন। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও কার্গো ট্যাংকের বাইরে ছোট ছোট চেম্বারে বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস থাকার সম্ভাবনার কথা জানাইয়াছেন। অতএব জাহাজ কাটার পূর্বে শুধু একটি নির্দিষ্ট ট্যাংক পরীক্ষা করিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতিটি আবদ্ধ স্থানের গ্যাস পরীক্ষা, বায়ু চলাচল নিশ্চিতকরণ এবং নিরাপদ ঘোষণা করার লিখিত প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।
এই ঘটনার আরেকটি দিক আরো নির্মম। শ্রমিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, আক্রান্ত কয়েক জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হইলেও তখন কারখানায় অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল না। ফায়ার সার্ভিস খবর পায় সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে, অথচ শ্রমিকেরা আক্রান্ত হইতে শুরু করেন সকাল ৯টার দিকে। জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থা যদি দুর্ঘটনার পর প্রস্তুত করা হয়, তাহা হইলে তাহাকে জরুরি ব্যবস্থা বলা যায় না। এখন তদন্ত কমিটির কাজ কেবল দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে সীমাবদ্ধ রাখা চলিবে না।
কোন কর্মকর্তা কোন নিরাপত্তা অনুমোদন দিয়াছিলেন, গ্যাস পরীক্ষা হইয়াছিল কি না, কে কাজের স্থানকে নিরাপদ ঘোষণা করিয়াছিলেন, পূর্বের পরিদর্শনে চিহ্নিত ঘাটতি সংশোধিত হইয়াছিল কি না, জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থা কেন প্রস্তুত ছিল না, এই সকল প্রশ্নের উত্তরও প্রকাশ্যে আসিতে হইবে। এই দুর্ঘটনার পর সকল জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে ঝুঁকি মূল্যায়নও নূতন করিয়া করা দরকার। এই ধরনের কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই, বাধ্যতামূলক গ্যাস পরীক্ষা ও গ্যাসমুক্তকরণের প্রত্যয়ন, প্রশিক্ষিত উদ্ধার দল এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৯টি পরিবার এখন ৯টি শূন্যতার সামনে দাঁড়াইয়া আছে। ক্ষতিপূরণ সেই শূন্যতা পূরণ করিতে পারিবে না; কিন্তু আইনানুগ ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা অন্তত প্রমাণ করিতে পারে যে, এই ৯টি মৃত্যু সম্পূর্ণ অর্থহীন হইয়া যায় নাই।