দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের জন্য গভীর সমুদ্রে সিংগেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ মুরিং স্থাপনের পর তা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। চার বছরেও এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। এই চার বছরে মোট চার বার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
এছাড়া প্রকল্পের ব্যয় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। সময় এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হলেও উলটো সময় বৃদ্ধির ফাঁদে পড়েছে প্রকল্পটি। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য কোম্পানি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশকিছু অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক এ দরপত্র নিয়ে এখন চরম বিতর্ক চলছে। বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আহ্বান করা এ দরপত্র গ্রহণের সময় নির্বাচন করা হয় বর্তমান মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন। স্বচ্ছতার অভাব থাকার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করে এর সুরাহা চেয়েছে বিশ্বখ্যাত কয়েকটি কোম্পানি। তারা পিপিআর এর শর্ত অনুযায়ী দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটির দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করার দাবি তুলেছেন।
প্রসঙ্গত, সিংগেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম হলো গভীর সমুদ্রে স্থাপিত এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে বড় ট্যাংকার থেকে অপরিশোধিত তেল বা জ্বালানি সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তীরে বা রিফাইনারিতে স্থানান্তর করা হয়। এটি সরাসরি তীরের জেটির সাথে সংযুক্ত না থেকে সমুদ্রে ভাসমান বয়া হিসেবে কাজ করে। এতে সময় এবং অর্থের সাশ্রয় হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জ্বালানির স্পর্শকাতর এ প্রকল্পটির অপারেশন এবং মেনটেইনেন্স কাজের জন্য আহ্বান করা আন্তর্জাতিক দরপত্রটির জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয় বিগত নির্বাচনের পাঁচ দিন পর এবং মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন। এমন দিনে দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মোট ১১টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্র কেনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি কোম্পানি দরপত্র জমা দিয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ের কথা বিবেচনা করে কোম্পানিগুলো নির্বাচনের পরে কোনো একদিন দরপত্র গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করতে অনুরোধ করে।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনি প্রচারণার সময় অন এরাইভাল ভিসা সুবিধা স্থগিত ছিল। অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশে চলাচলে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। নানা অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বের নামকরা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তাদের প্রযুক্তি দল পাঠাতে পারেনি। এ কারণে তারা পূর্ণাঙ্গ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। বেশির ভাগ কোম্পানি সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, দরপত্রের প্রি বিড মিটিংয়ে নেদারল্যান্ডের বিখ্যাত কোম্পানি স্মিত ল্যামনালকো এবং মিশরের ‘মেরিডাইভ’ অংশ নিলেও তারা চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয়নি। স্মিত ল্যামনালকো বিশ্ব জুড়ে ২২টিরও বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করছে। কোম্পানিটি দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও তা মানা হয়নি। অন্যদিকে দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে মিশরের কোম্পানি মেরিডাইভের পক্ষ থেকে ঢাকাস্থ মিশরীয় দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠানিক চিঠি দিলেও তাদের অনুরোধ রাখা হয়নি। মেরিডাইভ কাতার এলএনজি এবং আরামকোর সাথে যৌথভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছে।
জানা গেছে, সিংগেল পয়েন্ট মুরিং এর জন্য যে তিনটি কোম্পানি দরপত্র জমা দিয়েছে সেগুলো হলো-ইন্দোনেমিয়ার পার্তামিনা, চীনের সিপিসি এবং হিলন। এই তিনটি কোম্পানির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অদক্ষতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পার্তামিনা নিজ দেশেই ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কেলেংকারিতে জড়িত। দরপত্র কারচুপি ও নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহের কারণে তাদের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সিপিসি এর আগে বিনা টেন্ডারে মূল এসপিএম প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল। এসপিএম প্রকল্পের কাজ শেষ করতে তারা বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করেছে। এ প্রকল্পের ব্যয় যে কারণে দ্বিগুণ হয়েছে।
এছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ মালয়েশিয়াতেও সিপিসির বিলিয়ন ডলারের পাইপলাইন প্রজেক্ট বাতিল হয়েছে। সূত্রগুলো আরো জানায়, সিপিপি কোম্পানিটি ইপিসি সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ হলেও এসপিএম অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রমাণিত অভিজ্ঞতা প্রদর্শন করতে পারেনি—যা এ প্রকল্পের একটি গুরত্বপূর্ণ যোগ্যতা। এছাড়া চীনা কোম্পানি সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোএসএ এর সাথে একটি অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত ফান্ডিং কেলেংকারিতে যুক্ত থাকার কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।
এদিকে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আহ্বান করা দরপত্রটির নানা দিকে তুলে ধরে সম্প্রতি নেদারল্যান্ডের কোম্পানি স্মিত লামনালকো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে কোম্পানিটি দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নানা অসংগতির কথা তুলে ধরেছে। একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনঃদরপত্র আহ্বান করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো যাতে তাতে অংশ নিতে পারে তার জন্য উদ্যোগ নিতেও বলা হয়েছে ঐ চিঠিতে।