দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণসুবিধা পেতে শুরু করেছেন। আবেদনকারী প্রায় সব শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে একসঙ্গে প্রাপ্য সুবিধার একাংশের অর্থ ছাড় করেছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড এবং শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট।
দীর্ঘদিন ধরেই অবসরসুবিধার টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে সংকট চলছিল। এ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। অনেক শিক্ষক–কর্মচারীকে প্রাপ্য টাকা পেতে ঘুষ দিতে হতো।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অনিয়ম ও অবহেলার কারণে অবসরের পর প্রাপ্য অর্থ পেতে শিক্ষক-কর্মচারীদের তিন-চার বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ নিয়ে যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সরকারের এই উদ্যোগে তা অনেকাংশে কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পর থেকে অবসরসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বাড়তে থাকে। এ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।
তাদের মতে, এখন বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করেছেন।
এদিকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে অর্থ ছাড়ের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে আপাতত যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে, তা তাদের পুরো প্রাপ্য নয়। এখন শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, দ্রুত তাদের প্রাপ্য সুবিধার পুরো অর্থ পরিশোধ করা হবে। সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদনকারীদের পুরো প্রাপ্য অর্থ দ্রুত পরিশোধ করতে হলে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
গত শনিবার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিন আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়। তাদের মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের তথ্যও জানানো হয়।
তবে আপাতত যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে, তা তাদের পুরো প্রাপ্য নয়। এখন শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, দ্রুত তাদের প্রাপ্য সুবিধার পুরো অর্থ পরিশোধ করা হবে। সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদনকারীদের পুরো প্রাপ্য অর্থ দ্রুত পরিশোধ করতে হলে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে অবসরসুবিধার একাংশের টাকা ছাড় করা হয়েছে বা হচ্ছে। এ জন্য প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যারা আবেদন করেছেন, তাদের অনুকূলে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
অনেক শিক্ষক-কর্মচারী ইতিমধ্যে টাকা পেয়েছেন। যারা এখনো পাননি, তাদেরও পর্যায়ক্রমে দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে চার হাজারের বেশি আবেদনকারীর আবেদন অসম্পূর্ণ থাকায় তাদের অনুকূলে আপাতত অর্থ ছাড় করা যায়নি। এ ছাড়া আবেদনে বিভিন্ন ধরনের ভুল থাকায় আরও কিছু আবেদনকারীর অর্থ ছাড় আটকে আছে।
কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রেও একইভাবে একাংশের টাকা ছাড় করা হয়েছে। ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। একজন শিক্ষক-কর্মচারী অবসরসুবিধার পাশাপাশি কল্যাণসুবিধাও পান।
চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে যে চাঁদা কেটে রাখা হয়েছে, মূলত সেই অর্থ থেকেই এখন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক-কর্মচারী সর্বনিম্ন প্রায় ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। অন্যদিকে অবসরসুবিধার জন্য সর্বোচ্চ সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়।
কল্যাণ ট্রাস্টের একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এমন শিক্ষকও আছেন, যারা মাত্র কয়েক মাস চাকরি করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা পেয়েছেন। তবে অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী এর চেয়ে বেশি টাকা পেয়েছেন। কল্যাণসুবিধার জন্য ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আবেদনকারীদের অনুকূলে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
এবার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে অবসরসুবিধার একাংশের টাকা ছাড় করা হয়েছে বা হচ্ছে। এ জন্য প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যাঁরা আবেদন করেছেন, তাদের অনুকূলে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় অবস্থিত কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসরসুবিধা বোর্ডের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু শিক্ষক-কর্মচারী বা তাদের স্বজনেরা টাকা না পাওয়ার বিষয়ে খোঁজ নিতে এসেছেন। কর্মকর্তারা তাদের সমস্যার কথা শুনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে বলছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করা হয়। ফলে আবেদনে সামান্য ভুল থাকলেই অর্থ পাঠানো সম্ভব হয় না। ভুল সংশোধনের পর আবার অর্থ পাঠানো হবে।
ঢাকার পরিচিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অবসরসুবিধা বোর্ডের সচিবের দপ্তরে এসে জানতে চান, তার অবসরসুবিধার মোট প্রাপ্য অর্থ অনেক বেশি হলেও এবার তুলনামূলকভাবে কম টাকা কেন দেওয়া হয়েছে। তাকে জানানো হয়, আপাতত চাকরিকালে বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদার অংশের অর্থ দেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থ পরে দেওয়া হবে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি ফিরে যান।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করা হয়। ফলে আবেদনে সামান্য ভুল থাকলেই অর্থ পাঠানো সম্ভব হয় না। ভুল সংশোধনের পর আবার অর্থ পাঠানো হবে।
কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যালয়েও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। একজন অবসরপ্রাপ্ত নারী শিক্ষক জানান, তিনি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তার প্রশ্ন, বাকি অর্থ কবে পাবেন।
কর্মকর্তারা তাকে জানান, এটিও কল্যাণসুবিধার একাংশ; বাকি অর্থ পরবর্তী সময়ে দেওয়া হবে।
কোনো কোনো শিক্ষক বা তাদের স্বজনের কাগজপত্র প্রাথমিক যাচাই করে কারও জাতীয় পরিচয়পত্র, কারও ব্যাংক হিসাব, আবার কারও মনোনীত ব্যক্তির কাগজপত্রে সমস্যা পাওয়া যায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কল্যাণ ট্রাস্টের একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আইবাস প্লাস প্লাস’-এর মাধ্যমে টাকা দেওয়ার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্যের সঙ্গে আবেদনের তথ্য মিলতে হয়। তাই ভুল থাকলে টাকা ফেরত আসে। এসব সমস্যা সংশোধন করে আবার অর্থ পাঠানো হবে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
জানা যায়, সারা দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। তাদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা পরিচালিত হয় দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কল্যাণসুবিধা দেয় শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসরসুবিধা দেয় শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড।
শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করা চাঁদা, ব্যাংকে জমা থাকা অর্থের সুদ এবং সরকারের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া থোক বরাদ্দ ও বন্ডের মুনাফার ওপর নির্ভর করেই মূলত এই সুবিধার অর্থ পরিশোধ করা হয়।
অবসরসুবিধার জন্য চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ চাঁদা কেটে রাখা হয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই হারে চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এর আগে অবসরসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ২ শতাংশ হারে চাঁদা নেওয়া হতো।
এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরসুবিধা এবং ৩০ টাকা কল্যাণসুবিধা তহবিলে জমা হয়। বাকি অর্থ সরকার এবং তহবিলে জমা থাকা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়।
এখন পর্যন্ত আবেদন করা ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরসুবিধার পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। অবসরসুবিধা বোর্ডে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবার দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, সর্বোচ্চ গ্রেডের শিক্ষক অবসরসুবিধা হিসেবে মোট প্রায় ৩৮ লাখ টাকা এবং কল্যাণসুবিধা হিসেবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পেতে পারেন। গ্রেড ও চাকরিকালের ওপর ভিত্তি করে এই অর্থ কমবেশি হয়।
দুটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করা চাঁদা মিলিয়ে অবসরসুবিধার জন্য বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা জমা হয়। অথচ অবসর নেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ প্রতি মাসেই বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়।
এখন পর্যন্ত আবেদন করা ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরসুবিধার পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। অবসরসুবিধা বোর্ডে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবার দেওয়া হচ্ছে। ফলে বর্তমান তহবিলের অর্থ দিয়ে আবেদনকারীদের পুরো সুবিধা পরিশোধ করা সম্ভব নয়।