প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবিকে যুক্ত করায় কঠোর সমালোচনা করেছেন ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অবস্থানকে তিনি ‘অত্যন্ত রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলে অভিহিত করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান।
সাক্ষাৎকারে বীণা সিক্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা বিস্ময়কর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ধরনের মন্তব্য প্রকাশ করেছে, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনভিপ্রেত। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের গুরুত্ব সম্পর্কে ঢাকার আন্তরিকতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
সাবেক এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মনে করিয়ে দেন যে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদিই প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ভারতের প্রত্যাশা ছিল তিনি প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে নয়াদিল্লিকেই বেছে নেবেন। কিন্তু ছয় মাস পার হয়ে গেলেও ঢাকা সেই আমন্ত্রণের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। এমনকি কয়েক সপ্তাহ আগে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য দেওয়া দ্বিতীয় আমন্ত্রণের বিষয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবিকে রাজনৈতিক সফরের শর্ত হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করে বীণা সিক্রি বলেন, ‘প্রত্যর্পণ একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি প্রক্রিয়া, যা সম্পন্ন হতে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এটি ভালো করেই জানে। তাহলে কি তারেক রহমান আগামী কয়েক বছর ভারতে আসতে চান না?’ তিনি আরও যোগ করেন, দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতির একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে। সেই সুযোগটি কাজে না লাগিয়ে এ ধরনের অযৌক্তিক ও অপেশাদার শর্তারোপ করা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক ও অ-কূটনৈতিক আচরণ।
উল্লেখ্য, গত রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানিয়েছিলেন, সফরের পরিবেশ তৈরির জন্য শেখ হাসিনাসহ পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়া সফরের পরিবেশকে বিঘ্নিত করেছে বলেও ঢাকা দাবি করেছিল।
তবে ভারত সরকার ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, ওই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং এটি একটি বেসরকারি মিডিয়া আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল। বীণা সিক্রি মনে করেন, দুই দেশের সরকার যখন সফরের তারিখ চূড়ান্ত করতে আলোচনা চালাচ্ছে, তখন এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক প্রচার কূটনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে। তার মতে, বাংলাদেশ যদি গুরুত্বের সঙ্গে এই সফরটি সম্পন্ন করতে চায়, তবে এ ধরনের 'কৌশল' বাদ দিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় মন দেওয়া উচিত।
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে তার একটি উন্মুক্ত প্রেস অনুষ্ঠানে উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনরায় হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি তোলে এবং বিষয়টি তারেক রহমানের সফরের সঙ্গে যুক্ত করার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় অবিলম্বে ফেরত দিতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে, ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম নিশ্চিত করেছেন যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ চলমান থাকলেও কোনো চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।