ডারউইনের ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন পরীক্ষা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের উচ্ছ্বাস নিয়ে টাইগাররা পৌঁছে গেছে ম্যাকাইয়ে। তবে সেখানে পৌঁছানোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। যে যাত্রা স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, বিমান বিলম্বে সেটিই গড়িয়েছে প্রায় ১৪ ঘণ্টায়। গতকাল দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল শেষে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার কিছুক্ষণ আগে ম্যাকাইয়ে পৌঁছান বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। বিমানবন্দর ছাড়ার সময় তাদের চোখেমুখে ছিল স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। দলের সব সদস্যই একই ফ্লাইটে ছিলেন। গতকাল স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় ডারউইন থেকে ম্যাকাইয়ের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল বাংলাদেশ দল। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা ও বিলম্ব পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে রাত নেমে আসে ।
ডারউইন টেস্টে ৯ উইকেটের দাপুটে জয়ের পর এক দিনের বিশ্রাম পেয়েছিল দল। কিন্তু সেই বিশ্রামের পরের যাত্রাই হয়ে উঠল নতুন ভোগান্তি । এখন অবশ্য সেই ক্লান্তি পেছনে ফেলে দ্বিতীয় টেস্টের প্রস্তুতিতে মন দিতে হবে বাংলাদেশকে। ম্যাচটি শুরু হবে আগামী ২২ আগস্ট। চলবে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত । প্রতিদিন খেলা শুরু হবে বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টায় । ভেন্যু গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা। ম্যাকাইয়ের ইতিহাসে এটাই প্রথম পুরুষ টেস্ট। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ১২তম পুরুষ টেস্ট ভেন্যু হিসেবে অভিষেক হচ্ছে মাঠটির।
প্রায় ১০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই মাঠে শুধু স্থানীয় দর্শকই নয়, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশ থেকেও ক্রিকেটপ্রেমীরা আসছেন । ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোর পর দুই টেস্টের এই সিরিজ এখন অস্ট্রেলিয়া জুড়ে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার ১০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার বিষয়টিও ভেন্যুটির নিজস্ব তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াও ম্যাকাইয়ের এই অভূতপূর্ব সাড়াকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গের ভাষ্য, নর্দার্ন অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজকে ঘিরে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, টিকিট বিক্রির সাড়া তারই প্রতিফলন। বিশেষ করে ম্যাকাইয়ের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের সব টিকিট আগেই শেষ হয়ে যাওয়াকে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখছেন। ডারউইনে ২২ বছর পর টেস্ট ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন এবং ম্যাকাইয়ে প্রথম বার টেস্ট আয়োজন। দুই ঘটনাই নর্দার্ন টেরিটরি, কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য অঞ্চল এবং বিদেশি দর্শকদের মধ্যেও বাড়তি উৎসাহ তৈরি করেছে।
এই ম্যাচকে ঘিরে শুধু ক্রিকেট নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কুইন্সল্যান্ডের পরিবেশ ও পর্যটনমন্ত্রী অ্যান্ড্রু পাওয়েল মনে করছেন, আঞ্চলিক কুইন্সল্যান্ডে বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি অঞ্চলটির পরিচিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ম্যাকাইকে অস্ট্রেলিয়ার বড় ইভেন্ট আয়োজনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে আরো প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও এই টেস্টকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে কুইন্সল্যান্ড সরকার জানিয়েছিল, ম্যাকাইয়ে এই টেস্ট আয়োজন থেকে প্রায় ২০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। ম্যাকাইয়ের মেয়র গ্রেগ উইলিয়ামসনের দৃষ্টিতেও ম্যাচটির গুরুত্ব কম নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক ম্যাকাইয়ে আসছেন। ফলে স্থানীয় ব্যবসা, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটন খাতও এর সুফল পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে বড় ক্রিকেট আয়োজনগুলোতে ম্যাকাই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পর্যটক সমাগম এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম দেখা গেছে ।
বাংলাদেশের জন্য অবশ্য এই মুহূর্তে সব আলোচনার কেন্দ্রে ক্রিকেটই। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে আছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ফলে ম্যাকাইয়ে বাংলাদেশের লক্ষ্য হবে ইতিহাসকে আরো বড় করা । অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য হবে ঘুরে দাঁড়িয়ে সিরিজ সমতায় ফেরানো। দ্বিতীয় টেস্ট তাই চলমান সিরিজের ভাগ্য নির্ধারণের ম্যাচও। প্রথম টেস্টে ব্যর্থতার পর অস্ট্রেলিয়া অবশ্য স্কোয়াডে একটি পরিবর্তন এনেছে। ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ড বাদ পড়েছেন। তার জায়গায় ফিরেছেন ম্যাথু রেনশ। ওয়েদারাল্ড ডারউইনে প্রথম ইনিংসে ২৩ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে কোনো রান না করেই আউট হন । অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকেরা তাই ওপেনিংয়ে নতুন সমন্বয়ের পথে হেঁটেছেন। রেনশ ২০২৩ সালের পর আবার টেস্ট দলে ফিরলেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ডারউইনের জয়ের পর নিজেদের মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা । অস্ট্রেলিয়া এবার আরো মরিয়া থাকবে। নতুন ভেন্যু । নতুন পরিবেশ। নতুন চাপ। কিন্তু বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসও এখন অন্য উচ্চতায়। ম্যাকাইয়ের গ্যালারি সেই আত্মবিশ্বাসের সাক্ষী হতে প্রস্তুত । প্রথম দিনের সব টিকিট শেষ। দ্বিতীয় দিনও পূর্ণতার পথে। মাঠটি প্রথম বারের মতো টেস্ট ক্রিকেটের স্বাদ নিতে যাচ্ছে। আর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচেই বাংলাদেশের সামনে সুযোগ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের পর এবার সিরিজ জিতে আরো বড় ইতিহাস লেখা। ডারউইনে বাংলাদেশ দেখিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নামের পাশে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। ম্যাকাইয়ে এবার দেখার পালা, সেই সাহস কতটা গভীরে গেছে।