কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক। আগুন থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা বাংলাদেশি তিন নাগরিক জানিয়েছেন সেই রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।
মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত। ঘুমিয়ে ছিলেন গাজীপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আশরাফুল জামাল ও তার ভাই। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচিতে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। জানালা খুলে নিচে তাকিয়ে দেখেন, লোকজন চিৎকার করে বলছেন, ‘আগুন লেগেছে।’ বিষয়টি বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে ভাইকে নিয়ে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন আশরাফুল। কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘন ধোঁয়া ঢুকে পড়ে ঘরে। কোনোভাবে ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা ছাদে উঠে যান। দমকল বাহিনী আসার আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন তারা।
গত শনিবার থেকে ওই ভবনের চতুর্থ তলার হোটেলে ছিলেন আশরাফুল। ব্যবসায়িক কাজে তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন। আগুন লাগার সময় তার সঙ্গে ছিলেন ভাই। মুকুন্দপুরের একটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে তারা ঘুমিয়ে পড়েন। তখনও বুঝতে পারেননি, কয়েক ঘণ্টা পর তাদের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। গাজীপুরের বাসিন্দা আশরাফুল বলেন, ‘নিচে নামতে পারছিলাম না। কোনোভাবে ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ওই তলার সবাই ছাদে উঠি। আমরা ২০-২৫ জন ছিলাম। সবাই পানির ট্যাঙ্কের কাছে চলে যাই। বুঝতে পারছিলাম না, কোন দিক থেকে আগুন আসতে পারে। তবে আমরা ঠিক করেছিলাম, আগুনের শিখা দেখতে পেলেই ট্যাঙ্কের পানি নিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করব।’
একই হোটেলে থাকা ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নাজমুল সরকারও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। হৃদ্রোগের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া নাজমুল বলেন, একপর্যায়ে তার মনে হয়েছিল তিনি আর বাচবেন না। চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ায় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এবং অক্সিজেনের অভাব অনুভব করছিলেন।
নাজমুল বলেন, ‘হোটেলের কর্মচারীরা বারবার বলছিলেন, উপরে উঠুন। কিন্তু উপরে ওঠার রাস্তা এতটাই সরু যে একজন করে উঠতে পারেন। লোহার সিঁড়ি ছিল। কোথা দিয়ে পালাব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। নিচে নামার কোনো পরিস্থিতি ছিল না। পুরোটা ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল। এক হাত দূরেও কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া ভেতরে ঢুকে পড়ে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে কোনোভাবে উপরে উঠে যাই।’
অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বোর্ডার। তাদের দাবি, আগুন লাগার পরও হোটেলের কর্মীদের মধ্যে পর্যাপ্ত তৎপরতা দেখা যায়নি। এমনকি হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
বাংলাদেশ থেকে পরিবারের সদস্য ও সন্তানকে নিয়ে ওই ভবনের নিচতলার আরেকটি হোটেলে উঠেছিলেন কাউসার হোসেন। তিনি জানান, প্রথমে তারা আগুন লাগার বিষয়টি বুঝতেই পারেননি। ঘুমের মধ্যে হোটেলকর্মীরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে তাদের জাগিয়ে তোলেন। এরপর তারা দ্রুত হোটেল থেকে বের হয়ে আসেন। তবে বাইরে বের হওয়ার পর মনে পড়ে, ঘরের ভেতর তাদের পাসপোর্ট রয়ে গেছে। পরে পাসপোর্ট আনতে আবার হোটেলের ভেতরে ঢুকেছিলেন কাউসার।
কলকাতার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক।