রাকসুর ৬১ লাখ টাকার ভাউচার নিয়ে বিতর্ক, ভিপি বললনে—অডিট রিপোর্ট দেখানো হবে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) তহবিল থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি ও দাপ্তরিক ব্যয়ের জন্য নেওয়া অর্থের বিল-ভাউচার জমা না দেওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ।

তার দাবি, রাকসুর হিসাব এখনো চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়নি এবং অডিট সম্পন্ন হওয়ার আগে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে রাকসুকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, ছাত্রসংসদের মেয়াদ শেষে হওয়া অডিট রিপোর্ট সবার সামনে উপস্থাপন করা হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাকসু কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য নেওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থের একটি বড় অংশের ব্যয়ের বিল-ভাউচার এখনো জমা হয়নি। 

সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাকসুর বর্তমান পরিষদ ৪২টি কর্মসূচির বিপরীতে এক কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ নিয়েছে। এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার কোনো বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি। কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, এই তালিকায় ভিপি ও জিএসসহ এজিএস এবং একাধিক সম্পাদক রয়েছেন। 

প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, রাকসুর হিসাব চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বিচ্ছিন্ন তথ্য প্রকাশ করে ছাত্রসংসদকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি এক কোটি ২৯ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্যকেও অসত্য দাবি করে বলেন, অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে রাকসু সভাপতি, কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদন ও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।

তার দাবি, ছাত্রসংসদের মেয়াদ শেষে সরকারিভাবে অডিট হবে এবং সেই অডিট রিপোর্ট শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। অডিটে রাকসুর এখতিয়ারের বাইরে কোনো ব্যয় ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট অর্থ ফেরত দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নিজের দাপ্তরিক ব্যয়ের বিষয়ে ভিপি বলেন, তার জন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকা তুলেছেন। তবে প্রকাশিত তথ্যে অর্থ উত্তোলনের পাশাপাশি ফেরত দেওয়া বা এখনো চূড়ান্ত সমন্বয় না হওয়া অর্থের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া ইফতার মাহফিলের ১২ লাখ টাকার কোনো অর্থ রাকসু তহবিল থেকে নেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের নামে ছয় ধাপে ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার ভাউচার জমা দেওয়া হলেও ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার ব্যয়ের হিসাব জমা হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে দাপ্তরিক খরচ, ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা প্রদর্শন, ভিক্টরি রান ইউথ রাকসু এবং জুলাই জাদুঘর স্থাপনসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ নেওয়ার তথ্য রয়েছে। নথিতে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের নামেও সাত ধাপে ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা নেওয়ার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে তিন ধাপের ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ব্যয়ের ভাউচার জমা না দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে জিএস আম্মারের দাবি, ছয় সম্পাদকের মধ্যে পাঁচজন ভাউচার জমা দিয়েছেন এবং একজন সম্পাদকের ৮৫ হাজার টাকার ভাউচার বাকি থাকায় পুরো বাজেটকে পেন্ডিং দেখানো হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ভর্তি পরীক্ষার বুথের জন্য পাওয়া তিন লাখ দুই হাজার টাকা রাকসু তহবিলের নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া অর্থ।

এ ছাড়া ক্রীড়া সম্পাদক, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক, সংস্কৃতি সম্পাদক, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক এবং এজিএসের নামেও নেওয়া বিভিন্ন বরাদ্দের একটি অংশের বিল-ভাউচার জমা না হওয়ার তথ্য রয়েছে নথিতে। তবে কিছু কর্মসূচি চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিল এখনো জমা দেওয়া হয়নি বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি রয়েছে।

রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, যেকোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিল-ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। কিছু ভাউচার এখনো জমা হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত হিসাব জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী নতুন কোনো বরাদ্দ বা বাজেট নেওয়ার আগে পূর্বের অর্থের ভাউচার জমা দিয়ে তা সমন্বয় করার কথা। দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের অর্থ অসমন্বিত অবস্থায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রাজশাহীতে ফিরে রাকসু কোষাধ্যক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি আরও জোরদারভাবে মনিটরিং করা হবে বলেও জানান উপাচার্য।