জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় গুলিবর্ষণের শিকার হয়ে বাঁ পায়ের হাড় ভেঙে চুরমার ও প্রায় দেড় ইঞ্চি ক্ষয় হয়ে যাওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী মো. রাতুল হাসান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি নিজেই এই মর্মান্তিক ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১২তম সাক্ষী হিসেবে বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হন রাতুল হাসান। তেজগাঁও কলেজের মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী আন্দোলন চলাকালে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন।
মামলাটিতে চারজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম, বিজিবি কর্মকর্তা মো. রাফাত–বিন–আলম মুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান। আসামিদের মধ্যে রেদোয়ানুল ও রাফাত গ্রেপ্তার হয়ে সেনানিবাসের সাবজেলে বন্দি রয়েছেন এবং রাশেদুল ও মশিউর বর্তমানে পলাতক।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রাতুল হাসান জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে রামপুরা মালটিকেয়ার হাসপাতালের সামনে তাঁরা গণ–আন্দোলনে অংশ নেন। ওই সময় তাঁদের ঠিক সামনে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই আন্দোলনকারীদের ওপর হঠাৎ করে গুলিবর্ষণ শুরু করে বিজিবি ও পুলিশ।
প্রাণ বাঁচাতে তিনি বেটার লাইফ হাসপাতালের দিকে দৌড় দিলে একটি গুলি তার বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ দিয়ে পেছন থেকে ঢুকে সামনের দিকে বেরিয়ে যায়। গুলির মারাত্মক আঘাতে সেই ক্ষতস্থানের প্রায় দেড় ইঞ্চি পরিমাণ হাড় ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
ঘটনার পর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
জবানবন্দি চলাকালে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সামনে নিজের পায়ে লাগা গুলির গভীর ক্ষতস্থানটি প্রদর্শন করেন রাতুল। তিনি জানান, ঢাকা মেডিকেল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও দীর্ঘদিন কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে এবং তিনি এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।
জবানবন্দির শেষভাগে রাতুল হাসান উল্লেখ করেন, পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের খবরাখবর থেকে তিনি নিশ্চিত হন যে ঘটনার দিন বিজিবির রেদোয়ান ও মুন এবং পুলিশের মশিউর ও একজন এডিসি ঘটনাস্থলে গুলিবর্ষণ চালান। এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ওবায়দুল কাদেরের প্রত্যক্ষ নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ও দমনপীড়ন চালানো হয়েছিল বলেও তিনি জানতে পারেন। আদালতের কাছে তিনি এই নৃশংস গুলিবর্ষণে জড়িত প্রত্যক্ষ হামলাকারী এবং এর নেপথ্যে থাকা নির্দেশদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।