কলকাতায় অগ্নিকাণ্ড, আতঙ্কে তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশি পর্যটকরা

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বোর্ডিং হাউসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ অন্তত নয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর কলকাতায় অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি পর্যটক নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা অনেকেই ভারতে ভ্রমণের পূর্বপরিকল্পনা স্থগিত করছেন।

নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, স্যাডার স্ট্রিট ও কলিন স্ট্রিট এলাকার হোটেল সমিতি এবং ট্রাভেল এজেন্টরা জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের পর গত কয়েক দিনে আগাম টিকিট কেটে দেশে ফেরার প্রবণতা বেড়েছে। অনেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত সফর শেষ করতে চাইছেন।

গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট দিবাগত রাত প্রায় ১টা ৪০ মিনিটে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫জি নম্বর পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকা ‘শিখা ইন’ নামের একটি বোর্ডিং হাউসে আগুন লাগে। পশ্চিমবঙ্গের ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি পরিষেবা মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, ওই হোটেলে ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না এবং বৈধ পরিচালন পারমিটও ছিল না।

অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা পৌরসভা (কেএমসি) শহরের বোর্ডিং হাউসগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনায় পাঁচ সদস্যের একটি অডিট দল গঠন করেছে। ভবনের মালিক বীরেশ্বর মিত্রের সন্ধানে কলকাতা পুলিশও একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে।

স্বজনদের চাপে দ্রুত ফিরছেন অনেকে

অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশি পর্যটকদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক স্বজন তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছেন।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই ভবনেই ছিলেন পাবনার বাসিন্দা মো. খুরশীদ আলম। পরে মারকুইস স্ট্রিটের একটি হোটেলে ওঠেন তিনি। খুরশীদ বলেন, আগুনের খবর এবং বাংলাদেশিদের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ও বাবা-মা নিয়মিত ফোন করে বাড়ি ফিরে যেতে বলছেন। ব্যবসায়িক কাজে কলকাতায় আসায় দ্রুত কাজ শেষ করে শুক্রবার বিকেলেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।

শুধু অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্ক নয়, পরবর্তী প্রশাসনিক অভিযান ও তদন্তের মধ্যে হেনস্তার আশঙ্কাও পর্যটকদের অনেকে এলাকা ছাড়ার কারণ হিসেবে দেখছেন। ঢাকার বাসিন্দা ইসমাইল সরকার বলেন, এলাকার হোটেলগুলোতে প্রশাসনিক অভিযান চলাকালে আটকে পড়ার ঝুঁকি নিতে চান না তাঁরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কলকাতায় আসার কথা ভাববেন।

কলকাতার স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট গোপাল মান্না বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকে জরুরি ভিত্তিতে ফিরতি টিকিট করে দেওয়ার অনুরোধ করছেন।

‘মিনি বাংলাদেশ’ এ ফের ব্যবসায়িক ধাক্কার শঙ্কা

অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব পড়তে পারে কলকাতার নিউ মার্কেট ও আশপাশের ব্যবসায়েও। বাংলাদেশি পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত। করোনা মহামারি এবং বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে একসময় এই এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকের দৈনিক আগমন ঐতিহাসিক গড় প্রায় ৮ হাজার থেকে কমে ১ হাজারে নেমে এসেছিল।

গত জুলাইয়ে ভিসা প্রক্রিয়া কিছুটা শিথিল হওয়ার পর পর্যটক আসা বাড়তে শুরু করলে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মন্দা কাটিয়ে ওঠার আশা করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া আতঙ্ক সেই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

স্থানীয় হোটেল ও খুচরা ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমন কমে গেলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আবারও বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।