রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সমন্বিত, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর হোটেল শেরাটনে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) আয়োজিত ‘কনফ্লুয়েন্স ২০২৬: অংশীদারিত্ব, প্রশংসা এবং প্রতিশ্রুতির একটি আহ্বান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানানো হয়।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢআগমনের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে এবং দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করে মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনসহ রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সুযোগ বাড়িয়ে বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু প্রত্যাবাসনের বিষয়েই নয়, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনসহ রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিভিন্ন সুযোগ বাড়িয়ে বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে কোনোভাবেই বিশ্বের কাছে বিস্মৃত একটি সংকটে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে দেশের বৈদেশিক নীতির অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। সরকার কেবল মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সংকটটি পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং এর একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান অর্জনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসিনা রহমান বলেন, মানবিক এই সংকটের নয় বছর পার হলেও আগের গতানুগতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক সহায়তার জন্য বরাদ্দ তহবিল ক্রমেই কমে আসছে। একই সঙ্গে বিশ্বের মনোযোগও বিভিন্ন কারণে অন্যদিকে সরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী লাকি করিম বলেন, যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের রাখাইনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি তাদের টেকসই জীবিকার সুযোগও সৃষ্টি করতে হবে।
লাকি করিম বলেন, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানো গেলে মানবিক সহায়তার ওপর রোহিঙ্গাদের নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি পৃথক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকার, দাতা সংস্থা, মানবিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাবিদদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের অধিকার, চাহিদা এবং আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে অংশ নেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক ডিভিশনাল ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন বাংলাদেশের কর্মকর্তা হামাহ হোসেন এবং আইআরসি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ রিয়াসসহ অন্যরা।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আইআরসির রিজিওনাল অ্যাডভোকেসি স্পেশালিস্ট সাবিরা সুলতানা নুপুর।
এতে বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিও, শিক্ষাবিদ এবং রোহিঙ্গা সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।