দুর্ঘটনা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সাম্প্রতিক গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নারায়ণগঞ্জ জোনের সদস্যরা।
শনিবার (২২ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ জোনের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
সভায় শিল্পোদ্যোক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে প্রায় এক মাস ধরে অনেক কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ অথবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
তারা বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানাগুলোর গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক চাপও ক্রমেই বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত বকেয়া বিল পরিশোধের পাশাপাশি বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে সরকারের কাছে আবেদন জানানোর জন্য বিকেএমইএর প্রতি আহ্বান জানান শিল্পোদ্যোক্তারা।
একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, চলমান সংকটের সময়ে বকেয়া বিলের অজুহাতে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
বিকেএমইএ’র সদস্যরা অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তারা বলেন, অবিলম্বে সব ধরনের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি সিস্টেম লসও কমবে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা গেলে গ্যাসের অপচয় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এতে বৈধ গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে এবং গ্যাস ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সিস্টেম লসও কমে আসবে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরবরাহ ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার নির্ধারণের কথাও বলেন তারা। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রেখে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িতে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয় সভায়।
শিল্পোদ্যোক্তারা মনে করেন, সংকটের সময়ে গ্যাসের ব্যবহার খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার অনুযায়ী নির্ধারণ করা জরুরি। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে কার্যকর ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তারা।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশেরও দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের সর্বশেষ অবস্থা জনগণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো উচিত।
তারা বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত তথ্য না পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ঠিকভাবে করতে পারছে না। পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ও সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তাও কমবে।
খেলাপি ঋণের সময়সীমা ১২ মাস করার দাবি
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে চলমান চাপের বিষয়টিও মতবিনিময় সভায় তুলে ধরেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পখাত আগে থেকেই নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট যুক্ত হওয়ায় অনেক কারখানার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে গেছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সাময়িক আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রভাব রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক শিল্প খাতে পড়তে পারে।