আবারও কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন সোনিয়া গান্ধী। তাকে কংগ্রেসের অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। এর ফলে আপাতত নেতৃত্ব সংকট কেটেছে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলটির। স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনিই দলকে সামলাবেন।
সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। অন্যদিকে বিরোধী দল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। এই পরাজয়ের দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি তাত্ক্ষণিক তার পদত্যাগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও গত মাসে রাহুল কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে তিনি গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে সভাপতি করার আহ্বান জানান। কিন্তু গত ১০ আগস্ট ম্যারাথন বৈঠকের পরও নতুন সভাপতি নির্বাচন করতে পারেনি কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি। শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনা হয়েছে সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধীকেই।
রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পর কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সময় দলের দায়িত্বভার নেওয়ার মতো গান্ধী পরিবারের কেউ ছিলেন না। সোনিয়া গান্ধী সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না। রাহুল-প্রিয়াঙ্কা দুই জনই অল্প বয়সী ছিলেন। সেই ইন্দিরা যুগের পর গান্ধী পরিবারের বাইরে থেকে পি ভি নরসিংহ রাওকে দলের সভাপতি করা হয়। পাঁচ বছর তিনি দায়িত্ব সামলানোর পর দায়িত্ব পান সীতারাম কেশরি। তিনি পদে ছিলেন এক বছর। ততদিনে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে যান সোনিয়া গান্ধী। ফলে আবারও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আসে গান্ধী পরিবারেই। সভাপতি হন সোনিয়া গান্ধী। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক তিনি দলের দায়িত্বে থাকার পর ছেলে রাহুল গান্ধীকে সভাপতি করেছিলেন। কিন্তু মাত্র দেড় বছরের মাথায় রাহুল পদত্যাগ করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাহুলের সিদ্ধান্তে কংগ্রেসে বড় ধরনের ঝড় এসেছে। কারণ নির্বাচনে পরাজয় বা অন্য কোনো কারণে গান্ধী পরিবারের কারো পদত্যাগের নজির নেই বললেই চলে। যে কারণে রাহুলের পদত্যাগে অনেকটাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে কংগ্রেস। এ অবস্থায় গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে দলের দায়িত্ব দেওয়াটাও ছিল চ্যালেঞ্জের।
সর্বশেষ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন সভাপতি নির্বাচনে পাঁচটি গ্রুপ তৈরি করা হয়। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল— দেশের ভৌগোলিক চরিত্র অনুযায়ী এই পাঁচটি গোষ্ঠীতে ভাগ হয় ওয়ার্কিং কমিটি। এই পাঁচ সাব কমিটির সিদ্ধান্তের পর ওই দিন রাত ৮টায় ওয়ার্কিং কমিটি আরেকবার বৈঠকে বসে। এরপরই ঘোষণা করা হয় সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর নাম।
কংগ্রেসের এই বিপর্যয়ের সময় সোনিয়া গান্ধীকে ফিরিয়ে এনে দলটি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। আনন্দবাজার পত্রিকার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সোনিয়া গান্ধী মনে হয় বুঝতে পেরেছিলেন যে হাল না ধরলে দলটা সত্যিই টুকরো হয়ে যাবে।
এখন প্রশ্ন হলো, সোনিয়া কি কংগ্রেসকে নতুন দিশা দেখাতে পারবেন? একদিকে ক্রমশ; নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চতা বাড়িয়ে চলতে মরিয়া নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ। অন্যদিকে লোকসভা এবং রাজ্যসভায় বিজেপির দাপট রয়েছে। প্রতিটি বিরোধীদলের নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই-ইডির তদন্ত চলছে। এই চক্রব্যূহে সোনিয়া কিভাবে লড়বেন বিজেপির বিরুদ্ধে?
এর আগে ১৯ বছর কংগ্রেসের নেতৃত্ব সামলেছেন তিনি। বিদেশিনি থেকে হয়ে উঠেছেন ভারতীয় রাজনীতিতে অ-বিজেপি দলগুলোর প্রধান সূত্রধর। আবার এটাও সত্য যে, সোনিয়া গান্ধীর আমলেই কংগ্রেসের হাত থেকে উত্তরপ্রদেশ, বিহারসহ উত্তরের হিন্দি বলয়ে কংগ্রেসের শিকড় উপড়ে গেছে। অন্ধ্র ভেঙে তেলঙ্গানা করার জেরে দক্ষিণে পুরনো ঘাঁটি হারিয়েছে কংগ্রেস। ইউপিএ সরকারের আমলে অন্তরাল থেকে তিনি একের পর এক অধিকারভিত্তিক আইন তৈরিতে ভূমিকা নিয়েছেন। কাজের অধিকার, খাদ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, তথ্যের অধিকার। তাতে ভর করেই দ্বিতীয়বার ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।
আবার তার আমলেই ‘হিন্দুত্ব’ মাথাচাড়া দিয়েছে। ২০১৪ সালে কংগ্রেস ধরাশায়ী হওয়ার পরে এ কে অ্যান্টনিকে হারের ময়নাতদন্তের ভার দেওয়া হয়। অ্যান্টনি রিপোর্টে বলেন, কংগ্রেস সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি করে এমন ধারণায় ক্ষতি হয়েছে। দলের সংগঠনও দুর্বল হয়েছে। কংগ্রেস কখনোই বিজেপি, সিপিএমের মতো ক্যাডারভিত্তিক পার্টি ছিল না। কিন্তু দিনে দিনে কংগ্রেস আরো আরাম কেদারায় বসে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত নেতানেত্রীর দল হয়ে উঠেছে।
কংগ্রেসের এই নেতারা এখনো মনে করেন, মোদি-শাহ জুটি শুধু টাকা ও মেরুকরণ-জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করে ভোটে জেতেন। কিন্তু তাদের পরিশ্রম, দিনের পর দিন রাজ্য সফর, সংগঠনের কাজ, নেতাকর্মীদের দিয়ে কাজ করানো এবং মতাদর্শ মতো নতুন ভারত তৈরির অদম্য ইচ্ছাকে কংগ্রেস নেতারা স্বীকার করতে চান না।
রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের এই রাজনীতি করার সংস্কৃতি ভাঙতে একটা ঝাঁকুনি দিতে চেয়েছিলেন। তৃণমূল থেকে নতুন মুখ তুলে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। তিনি এখন দেশ জুড়ে পদযাত্রায় নামার কথা ভাবছেন। তবে সেটা হার থেকে শিক্ষা নিয়ে। এমন অবস্থায় সোনিয়া গান্ধীকে সভানেত্রীর পদে ফিরিয়ে আনা কংগ্রেস নেতাদের চূড়ান্ত সততার নিদর্শন। তারা স্বীকার করে নিয়েছে যে, গান্ধী পরিবার ছাড়া কংগ্রেসে ভরসা করার মতো আর কেউ নেই।
রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর দল যখন ভাঙনের মুখে তখন হাল ধরেছিলেন সোনিয়া। একই আশঙ্কায় আবারও ফিরে এসেছেন। কোনো ব্যক্তি নয়। পরিস্থিতি তাকে নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে। এখন তিনি দলের পরিস্থিতি বদলাতে পারেন কি না, সেটাই দেখার।