মেঘনার ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া

রাক্ষুসে মেঘনার করাল গ্রাসে ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। চলতি বর্ষায় তীব্র নদীভাঙনের মুখে হরণী, চানন্দী, চর ঈশ্বর, নলচিরা ও সুখচর ইউনিয়নের বিশাল অংশসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে শত শত একর ফসলি জমি, বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, রাস্তাঘাট ও হাটবাজার নিশ্চিহ্ন হয়েছে।

এ ছাড়া গত কয়েক বছরে মেঘনার প্রবল ভাঙনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, স্লুইসগেট, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মানুষের যাতায়াতব্যবস্থা মূলত নৌযাননির্ভর। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকা এই জনপদের মানুষের জীবন ও জীবিকা এখন নদীভাঙনের কারণে চরম হুমকির মুখে।

মেঘনার তীব্র ভাঙনে ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে শত শত পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। বাস্তুভিটাহারা অনেক পরিবার নিরুপায় হয়ে নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চল ও বেড়িবাঁধের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নদীতে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হওয়ায় শিক্ষার্থীরাও পড়ালেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আরও বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে।

ভাঙনে বাস্তুভিটাহারা লোকজন জানান, একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে তারা দিশেহারা। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনবসতিপূর্ণ এসব এলাকার অবশিষ্ট জমি, মানুষের জানমাল এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা অচিরেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। সন্তানদের পড়ালেখা নিয়েও উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা।

বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর হাতিয়ার মানুষের প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে অগণিত ঘরবাড়ি, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, মসজিদ, মন্দির, মক্তব, মাদ্রাসা, হাটবাজার, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা। হাতিয়ায় বসবাসরত প্রায় ৭ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় নদীভাঙন রোধ করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

নদীতে বিলীন হচ্ছে হাতিয়ার চর ঈশ্বর ইউনিয়ন। ছবি: ইত্তেফাক

জানা যায়, ১৯৬৫ সাল থেকে হাতিয়ায় নদীভাঙন শুরু হয়। ১৯৭০ সাল থেকে ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এদিকে হাতিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ ব্যবসায়িক কেন্দ্র আফাজিয়া বাজারও নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। বর্তমানে বাজারের উত্তর প্রান্তে এসে ঠেকেছে নদী। সামান্য জোয়ারেই বাজারের রাস্তাঘাটে হাঁটুপানি জমে যায়। এতে যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। নদীভাঙনের আশঙ্কায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নতুন অবস্থাতেই ভেঙে সরিয়ে নিতে হচ্ছে।

নদীভাঙনের কারণে হাতিয়ার মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বহুমুখী ভাঙনের কারণে প্রতিবছর হাতিয়ার মানচিত্র থেকে সহস্রাধিক বসতবাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। এসব বাড়িঘরের বাসিন্দারা জীবনযাপনের তাগিদে সাগরের বুকে নতুন জেগে ওঠা চর, খাসজমি ও বেড়িবাঁধের পাশে আশ্রয় নিচ্ছেন। এসব এলাকায় নেই পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়কেন্দ্র। নদীভাঙনের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস এসব অসহায় মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

হাতিয়ার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নদীভাঙনের ফলে কৃষকেরা প্রতিনিয়ত কৃষিজমি হারাচ্ছেন। এতে দিন দিন ফসল উৎপাদন কমছে এবং বাড়ছে মানুষের অনিশ্চিত জীবনযাত্রা।

ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ফেলার মতো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এতে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও তীব্র জোয়ারের কারণে ভাঙন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই ব্লক নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া দ্বীপটির অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন।

এদিকে গত ১৭ মে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি নোয়াখালীর মেঘনাভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি হাতিয়ার মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙন রোধে অচিরেই স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, মেঘনা নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে।