গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় (ডিআরসি) ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, দেশটিতে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৫১৫ জনের শরীরে ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন ২ হাজার ৬৪২ জন।
রোববার (২৩ আগস্ট) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ইতুরি ও নর্থ কিভু প্রদেশে নতুন করে ৫১ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
ডিআরসিতে এবারের প্রাদুর্ভাব দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা সংকটে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত মে মাসের মাঝামাঝি এই প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি দেশটিতে ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এটিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিবেশী উগান্ডাকেও সতর্কতার আওতায় রাখা হয়েছে।
সংক্রমণের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে এবারের প্রাদুর্ভাব ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারির ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন।
ডিআরসির সরকারি তথ্য বলছে, জুনের শুরুতে ইবোলায় মৃত্যুহার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই মারা যাচ্ছেন।
ইবোলা মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীরাও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চলমান সশস্ত্র সংঘাত। এর সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চিকিৎসাকর্মীদের ওপর হামলা, কাজের প্রয়োজনে মানুষের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ইবোলার ‘বুন্দিবুগিও’ ধরন শনাক্ত হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে বিরল। এই ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো অনুমোদিত কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে ডব্লিউএইচও ডিআরসিকে ৭০ হাজার ডোজ ‘এরভেবো’ টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইবোলার বিরুদ্ধে অনুমোদিত এই টিকা আগের বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসসহ সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ডিআরসিতে চলমান কার্যক্রম আরও দুই থেকে তিন গুণ বাড়াতে হবে। আক্রান্ত প্রতিটি এলাকায় দ্রুত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সময়মতো বেতন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুসসালামি নাসিদি বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার মতে, এটি এখন আর শুধু জাতীয় বা আঞ্চলিক সংকট নয়; বরং বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এদিকে রোববার ভ্যাটিকানে প্রার্থনার সময় ডিআরসিতে ইবোলা সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পোপ লিও। তিনি সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও জোরালোভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান, যাতে যত বেশি সম্ভব মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।
সূত্র: আলজাজিরা