বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা মোহাম্মদ রাফি হোসেনের প্রতিষ্ঠান ফ্যাসেট এবার স্ট্রাইপ, রিভল্ট ও ফোনপের মতো বৈশ্বিক ইউনিকর্নদের কাতারে নাম লেখাল। জাপানের এসবিআই গ্রুপের নেতৃত্বে ৬৮ মিলিয়ন ডলার ডলারের সিরিজ সি ফান্ডিং পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভ্যালুয়েশন দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলারে। বৈশ্বিক ফিনটেক খাতে কোনো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠাতার হাতে গড়া কোম্পানির এটিই প্রথম ইউনিকর্ন হওয়ার ঘটনা।
গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেমের পেমেন্ট আদান প্রদানে বাড়তি ফি, ধীর লেনদেন আর জটিল প্রক্রিয়ার কারনে যখন উন্নয়নশীল দেশগুলো অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে রয়েছে, তখন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নে পড়াশোনা করা রাফি হোসেন, তার টিম নিয়ে ক্রস বর্ডার পেমেন্ট সলিউশ্যনে ফ্যাসেটের মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
২০১৯ সালে শুরু করে থেকে বর্তমানে ফ্যাসেট ১২৫টি দেশে ৩০ লাখেরও বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। বিশ্বের এক হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। রিপল, সার্কেল ও মর্ফোতে বিনিয়োগকারী জাপানের অন্যতম বড় আর্থিক গোষ্ঠী এসবিআই গ্রুপ এই রাউন্ডে নেতৃত্ব দিয়েছে। সিরিজ বি থেকে জয়েন করা স্পিডইনভেস্টও বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার, রিমোট ওয়ার্কার আর বিদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী উদ্যোক্তাদের জন্য ফ্যাসেটে প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে দ্রুত ও কম খরচে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রসেসিং করছে। গ্লোবাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর না থাকার কারনে বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে টাকা তুলতে ফ্রিল্যান্সার আর ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে অপারেট করা বাংলাদেশি ব্যাবসায়ীদের বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হত, ফ্যাসেট সেই বাধা কমিয়ে আনছে।
আর যেহেতু ফ্যাসেটের লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণকারীরা সরকারের আড়াই শতাংশ রেমিট্যান্স প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ কোনো ফ্রিল্যান্সার ফ্যাসেটের মাধ্যমে এক হাজার ডলার পেলে ক্লায়েন্টের দেওয়া টাকার উপরে সরকার থেকে আরও প্রায় আড়াই হাজার টাকা বাড়তি পাবেন। বেশিরভাগ অনানুষ্ঠানিক পেমেন্ট চ্যানেলে এই সুবিধা নেই।
ফ্যাসেটের এআই-চালিত অবকাঠামোর মূলে রয়েছে "ঔন নেটওয়ার্ক", ফ্যাসেটের নিজস্ব নিয়ন্ত্রিত আর্থিক অবকাঠামো যা বিশ্বের ১০০টিরও বেশি ব্যাংকিং করিডোরে ব্যাংক, টেলিকম, পেমেন্ট প্রদানকারী ও নিষ্পত্তি নেটওয়ার্ককে একসূত্রে যুক্ত করে।
এসবিআই গ্রুপের চেয়ারম্যান ইযোশিতাকা কিতাও বলেন, 'ফ্যাসেট যে কাজটা করছে সেটা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাপান ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোর মধ্যে যে আর্থিক দূরত্ব আছে, ফ্যাসেট সেটা দূর করতে পারে। স্টেবলকয়েনের মাধ্যমে রেমিট্যান্স ও আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করাটা আমাদের এশিয়া-প্যাসিফিক কৌশলের বড় একটা অংশ। ফ্যাসেট সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।'
স্পিডইনভেস্টের জেনারেল পার্টনার স্টেফান ক্লেস্টিল বলেন, 'উন্নয়নশীল দেশের মানুষ ও ব্যবসাগুলো বৈশ্বিক আর্থিক সুবিধা থেকে এখনো অনেকটা বাইরে। ফ্যাসেট সেই সুযোগটা তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে থেকে। রাফি, ডেনিয়েল ও তাঁদের পুরো দলের এই যাত্রায় পাশে থাকতে পেরে আমরা গর্বিত।'
সিরিজ সি থেকে পাওয়া অর্থ তিনটি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে ফ্যাসেটের। ঔন নেটওয়ার্কের পরিসর আরও বাড়ানো, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও ডিজিটাল সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এআই প্রযুক্তির আরও গভীর ব্যবহার এবং সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে ব্যবসা ও বড় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবার জন্য নতুন আর্থিক সেবা চালু করা।
ফ্যাসেটের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রাফি হোসেন বলেন, 'আমরা এমন একটা ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়তে চাই যেখানে কে কোথায় আছেন, কোন দেশের নাগরিক, কোন মুদ্রায় আয় করেন, সেটা আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। যেকোনো মানুষ, যেকোনো জায়গা থেকে, যেকোনো সম্পদে প্রবেশ করতে পারবেন। বর্তমান ব্যাংকিং কাঠামো এই সুবিধা দিতে পারছে না। তাই আমরা সেই কাঠামোর উপরে নতুন একটা স্তর বানাচ্ছি না, পুরোটাই নতুন করে গড়ছি।'