ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ও ইউক্রেনে রুশ সামরিক স্থবিরতা পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে উল্লেখ করে বিশ্বমঞ্চে জাতিসংঘের গুরুত্ব কমে যাওয়ার কথা নাকচ করেছেন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
প্রায় এক দশক দায়িত্ব পালনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের নিজ কার্যালয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে গুতেরেস এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, মার্কিন আধিপত্যের পতন, নতুন শক্তির উত্থান এবং স্নায়ুযুদ্ধের পরাশক্তিগুলোর নিজেদের পছন্দমতো যুদ্ধে নির্ণায়ক জয় পেতে ব্যর্থ হওয়া, এসবই বর্তমান বিশ্বকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, আর্থিক সংকট, কর্মীদের মনোবল হ্রাস এবং পরাশক্তিগুলোর বিভাজনে জর্জরিত জাতিসংঘ যদি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারে, তাহলে এই বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব চরম সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে।
পরাশক্তিগুলোর এখন নিজেদের ক্ষমতার সীমা বোঝার সময় এসেছে, বলেন গুতেরেস। সাম্প্রতিক সময়ে যা ঘটেছে তার দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেদের ইচ্ছা বা সামরিক শক্তি চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
তিনি ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণের উদাহরণ দিয়ে বলেন, মস্কো আশা করেছিল অভিযান কয়েক দিনেই শেষ হবে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল তেহরান দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ছয় মাস পরও ইরানের শাসকগোষ্ঠী টিকে আছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে।
গুতেরেস বলেন, পরাশক্তিগুলোকে বুঝতে হবে যে পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিভিন্ন দেশের প্রভাব-প্রতিপত্তির ভারসাম্যও পাল্টে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হিসেবে দেখার ধারণাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। গাজায় শান্তি ফেরাতে এই প্ল্যাটফর্ম কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি করতে পারেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যত জটিলতাই থাকুক না কেন, গাজায় কী ঘটছে, কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং কতটা অগ্রগতি হয়েছে। এর দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট যে জাতিসংঘের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বরং অন্যরা কী করছে, তা নিয়ে তাদেরই চিন্তিত হওয়া উচিত, বলেন তিনি।
গুতেরেসের মেয়াদে জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা কিছুটা ম্লান হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি সংঘাতের চেয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ইউক্রেন, গাজা ও ইরানের মতো যুদ্ধে মধ্যস্থতা করা সত্যিই কঠিন ছিল। কারণ নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা সংস্থাটিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে রেখেছে।
বর্তমানে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজ করছে। যেসব দেশ নিয়ম ভাঙছে তাদের সরাসরি সতর্ক করা বা শাস্তি দেওয়ার মতো কার্যকর কোনো নিরাপত্তা পরিষদ না থাকায় জাতিসংঘের প্রভাব ও দরকষাকষির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে, বলেন গুতেরেস।
তিনি জানান, সাইপ্রাসে সাম্প্রতিক সফরসহ বিভিন্ন জায়গায় মধ্যস্থতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আজকের দিনে মধ্যস্থতা অত্যন্ত কঠিন এবং এর ফলাফলও সীমিত। কিন্তু আমরা হাল ছাড়ছি না।
জাতিসংঘের কণ্ঠস্বর ‘ক্ষীণ’ হয়ে এসেছে, এমন সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ, হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং গাজায় ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণের বিষয়ে তার মতো স্পষ্ট ভাষায় খুব কম লোকই কথা বলেছেন। ইসরায়েল ও রাশিয়া উভয়ই এ কারণে তার ওপর ক্ষুব্ধ। কিন্তু তিনি মনে করেন, জাতিসংঘ ইতিহাসের সঠিক পথেই ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে সহায়তা প্রত্যাহার করেছে এবং বড় অঙ্কের বকেয়া রয়েছে। আর্থিক চাপের কারণে গুতেরেসকে কঠোর বাজেট ছাঁটাই করতে হয়েছে। হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৬ সালের বাজেটে পদের সংখ্যা ২২ শতাংশ কমানো হয়েছে। শান্তিরক্ষী বাহিনীর সেনা সংখ্যাও ২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে।
অনেকে ভেবেছিলেন জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থা হয়তো ভেঙে পড়বে। কিন্তু কোনো কিছুই ভেঙে পড়েনি। আমাদের ব্যাপ্তি কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু সংস্থাগুলো ধসের মুখোমুখি হয়নি, বলেন তিনি।
গুতেরেস মধ্যম শক্তি ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর উত্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ভারত ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোকেও ১৯৪৫ সালের কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পরাশক্তিগুলো যদি দ্রুত সংস্কার না করে, তাহলে বহুমেরু ব্যবস্থা প্রতিযোগিতা ও চরম সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের ইউরোপও ছিল বহুমেরুভিত্তিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক সুশাসনের কোনো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান না থাকার চূড়ান্ত ফল ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে তিনটিই ইউরোপের হওয়া টেকসই নয়। দিনশেষে বাস্তবতাই জয়ী হবে। নিরাপত্তা পরিষদকে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির প্রভাব-প্রতিপত্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।”
ডিসেম্বরে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। উত্তরসূরির প্রতি তার একমাত্র পরামর্শ, নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখুন এবং যা সঠিক মনে করেন সেটাই করুন।
সব জটিলতা সত্ত্বেও গুতেরেস মনে করেন, বিগত আট দশকে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অবদান হলো পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ এড়ানো। জাতিসংঘ মহাসচিবের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। আমাদের কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া যাবে না। কেবল একটি স্বর আছে এবং সবাইকে একসঙ্গে আহ্বান করার সামর্থ্য আছে।