নেপালে গত বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আবারও দেখাইয়া দিল, প্রকৃতির শক্তির সম্মুখে মানুষ কতটা অসহায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে প্রস্তুতির সামান্য ঘাটতিও কী ভয়াবহ পরিণতি ডাকিয়া আনিতে পারে। পাহাড় হইতে নামিয়া আসা এই হড়পা বান গ্রামের পর গ্রাম বিধ্বস্ত করিয়াছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বত মিলাইয়া মৃতের সংখ্যা দুই শতাধিক এবং নিখোঁজের সংখ্যা ১ হাজারেরও অধিক বলিয়া জানা গিয়াছে। নজিরবিহীন এই বন্যা কতটা প্রলয়ংকরী ছিল, তাহা প্রত্যক্ষ করিল সমগ্র বিশ্ব। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রাসুয়ার শান্ত সকাল বিভীষিকাময় হইয়া উঠে।
ভোতে কোশি অববাহিকায় হঠাৎ পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাইয়া ভোতে কোশি নদী দিয়া তীব্র স্রোত ত্রিশূলী নদীব্যবস্থার দিকে নামিয়া যাইতে থাকে। পানির সহিত ভাসিয়া আসা প্রচুর পলি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ চোখের পলকে সকল কিছু তছনছ করিয়া দেয়! বিজ্ঞানীদের ধারণা, উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বড় ধরনের বরফ ও পাথরের ধস হইতেই এই বিপর্যয়ের শুরু। তবে বিপদ এখনো কাটে নাই! দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা রহিয়াছে। আর উহা ঘটিলে তাহার রেশ আছড়াইয়া পড়িতে পারে এই অঞ্চলের বাহিরেও, যাহা কখনোই কাম্য নহে।
মানুষের বসতি, সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো এইভাবে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে প্রবল ে স্রাতে বিলীন হইতে দেখিয়া স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিতে পারে, এই রকম বিপর্যয় বা দুর্যোগ ঠেকানো না গেলেও প্রাণহানি কমানো কি অনেকাংশেই সম্ভব নহে? মূলত এই জায়গাটিতেই আমাদের সবচাইতে বড় দুর্বলতা-প্রস্তুতির ঘাটতি। বিশ্বব্যাপী আজ আমরা কী প্রত্যক্ষ করিতেছি? একপ্রান্তে দাবানলের লেলিহান শিখা তো, অন্যপ্রান্তে বানের দাপট; এক অঞ্চল অনাবৃষ্টিতে মরুময় হইয়া উঠিতেছে তো, অন্য অঞ্চল কাঁপিতেছে কনকনে শীতের প্রকোপে; এক দেশকে ভূমিকম্প কাঁপাইতেছে, তো আরেক দেশকে উড়াইয়া লইয়া যাইতেছে সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাসে। এ কোন পৃথিবীকে দেখিতেছি আমরা? জলবায়ু যেন ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাইতেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও জাতিসংঘের আহ্বান, এই বাস্তবতায় আগাম সতর্কবার্তা ও আগাম পদক্ষেপ এখন বিলাসিতা নহে, বরং উহা জীবন রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তবে উন্নত বিশ্ব ইতিমধ্যে সেই মোতাবেক প্রস্তুতির কাঠামো গড়িয়া তুলিতে পারিলেও, পিছাইয়া রহিয়াছে দরিদ্র দেশসমূহ। বাংলাদেশের ন্যায় জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশসমূহ জাতিসংঘের উদ্যোগে বহুমাত্রিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করিলেও তাহা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নহে। অতএব, কেবল কাগজে পরিকল্পনা থাকিলেই চলিবে না। পাহাড়ি ঢল, নদীর পানি বৃদ্ধি, ভূমিধস কিংবা অতিবৃষ্টির ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করিয়া সেইখানে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, সাইরেন, মোবাইল সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক দ্রুত পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। সতর্কবার্তা পৌছানোর পর মানুষ কোথায় যাইবে, কে তাহাদের সরাইবে এবং জরুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হইলে বিকল্পব্যবস্থা কী হইবে-এই সকল প্রশ্নের উত্তর দুর্যোগের পূর্বেই প্রস্তুত রাখা জরুরি। উন্নত বিশ্ব জলবায়ু মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ লইতেছে, জলবায়ু সংস্থাগুলোই-বা কী ধরনের বার্তা দিতেছে, তাহার প্রতি সতর্ক-সজাগ দৃষ্টি রাখা জলবায়ু সংকটের মুখে থাকা দেশসমূহের জন্য আজ অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছে। সংকটাপন্ন কোনো অঞ্চলে ঘুরিতে গেলে পর্যটকদেরও আবহাওয়ার হালনাগাদ তথ্য রাখা প্রয়োজন।
প্রকৃতিকে আমরা নির্বিচারে ক্ষতবিক্ষত করিব, পাহাড় কাটিব, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করিব, জলাভূমি ধ্বংস করিব এবং অতঃপর দুর্যোগ আসিলে কেবল প্রকৃতিকে দোষারোপ করিব-এই আত্মপ্রবঞ্চনার অবসান ঘটাইতে হইবে। প্রকৃতি প্রতিশোধ লয় কি না, তাহা লইয়া বিতর্ক থাকিতে পারে: কিন্তু মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত ও পরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড যে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বহু গুণ বাড়াইয়া দেয়, তাহাতে সন্দেহ নাই। অর্থাৎ, রাসূয়ার বিপর্যয় কেবল নেপালের শোকের সংবাদ নহে, ইহা আমাদের জন্যও এক কঠিন সতর্কবার্তা। পৃথিবী বদলাইতেছে, জলবায়ু পরিবর্তিত রূপ পরিগ্রহ করিতেছে মুহুর্মুহু। এমন একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হইল, আমরা সেই অনুযায়ী প্রস্তুত হইতে পারিতেছি কি না? প্রাকৃতিক দুর্যোগ আটকাইবার ক্ষমতা হয়তো আমাদের হাতে নাই; কিন্তু দুর্যোগকে মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হইতে না দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই।