শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা, বিএনপি নেতাকে অব্যাহতি

নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কৌশলে জিম্মি করে দীর্ঘদিন ধরে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এ চক্রের খপ্পরে পড়ে এক শিক্ষার্থী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেছেন।

গত ২৬ আগস্ট কেন্দুয়া থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং আদালতে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম।

মামলার পরপরই কেন্দুয়া পৌরশহরের সাউদপাড়া গ্রামের মৃত ছনু মিয়ার ছেলে আব্দুর রাজ্জাক ওরফে আবু মিয়া (৩৬) গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে মামলার প্রধান আসামি কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ভূইয়া বকুল (৫৫) পলাতক রয়েছেন।

মামলার অপর তিন আসামি হলেন রফিকুল ইসলাম ভূইয়া বকুলের স্ত্রী জাহানারা বেগম, মেয়ে মোছা. লিমা এবং টেংগুরী গ্রামের জনির স্ত্রী মোছা. স্মৃতি।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওই শিক্ষার্থীকে তার আত্মীয় রফিকুল ইসলাম ভূইয়া বকুল একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় ধর্ষণের ঘটনা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা হয়। ওই সময় মেয়েটি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পরে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয় এবং বিষয়টি পরিবারের কাছে প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে রফিকুল ইসলাম ভূইয়া বকুলের সহযোগী এক নারী ওই শিক্ষার্থীকে একটি বাসায় নিয়ে যান। সেখানে আরও কয়েকজন তাকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়েও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট মেয়েটি চট্টগ্রামে তার বড় ভাইয়ের বাসায় গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে পুরো ঘটনা জানায়।

গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরীক্ষা করানো হলে মেয়েটি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়। এরপর ২৫ আগস্ট বাড়িতে ফিরে আসার পর পরিবারের সদস্যরা ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারেন। পরে তারা থানায় মামলা করেন।

এদিকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রফিকুল ইসলাম ভূইয়া বকুলকে বিএনপির সব দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন খান বলেন, ‘কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি, যার কর্মকাণ্ডে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাকে দলে রাখার সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তির দায়ভার দল নেবে না।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কেন্দুয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সজল সরকার বলেন, ‘মামলার দ্বিতীয় আসামি মো. আবু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পুলিশ রিমান্ডে এনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।’

এদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কেন্দুয়া পৌরশহরের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নানা প্রলোভন ও কৌশলে জিম্মি করে একটি শক্তিশালী চক্র দেহ ব্যবসায় জড়ানোর চেষ্টা করছে। শুধু দেহ ব্যবসা নয়, এসব মেয়েকে দিয়ে মাদক ব্যবসাও করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।