বড় কোনো সওয়াব অর্জন করতে হলে অনেক সময়, শারীরিক কষ্ট কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন—এমন ধারণা অনেকেরই আছে। অথচ ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো, বান্দার ছোট ছোট ভালো কাজকেও আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দিতে পারেন। দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও এমন কিছু আমল করা সম্ভব, যেগুলোর জন্য খুব বেশি সময় বা কষ্টের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু রয়েছে বড় সওয়াবের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন হয়ে পুরুষ বা নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, আমি নিশ্চয়ই তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করব এবং তাদের কাজের জন্য সর্বোত্তম পুরস্কারে ভূষিত করব।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৭)
কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত এমন সাতটি সহজ আমল জেনে নেওয়া যাক।
মসজিদে জামাতে নামাজ
পুরুষের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। একাকী ঘরে বা কর্মস্থলে নামাজ আদায়ের তুলনায় জামাতে নামাজ পড়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি একাকী ঘরে বা বাজারে নামাজ পড়ার চেয়ে মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়লে ২৫ গুণ বেশি সওয়াব পায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭)
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায়ের মাধ্যমে ইবাদতের পাশাপাশি মুসলিমদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বও দৃঢ় হয়।
জানাজায় অংশ নেওয়া
কোনো মুসলমানের মৃত্যুর পর তার জানাজার নামাজে অংশ নেওয়া এবং দাফন পর্যন্ত সঙ্গে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জানাজায় উপস্থিত হয়ে নামাজ আদায় করে, সে এক কিরাত সওয়াব লাভ করে। আর যে ব্যক্তি দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই কিরাত সওয়াব পায়। দুই কিরাতের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি দুটি বিশাল পাহাড়ের সমতুল্য বলে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩২৫)
অল্প সময়ে বেশি ফজিলতের জিকির
কাজের ফাঁকে বা চলাফেরার সময় জিকির করা যায়। এর মধ্যে একটি হলো—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর।’
এর অর্থ, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। রাজত্ব ও সব প্রশংসা তারই এবং তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার এই জিকির পাঠ করবে, সে ১০ জন দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব পাবে, তার আমলনামায় ১০০টি পুণ্য লেখা হবে, ১০০টি পাপ মাফ করা হবে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তানের উপদ্রব থেকে সুরক্ষিত থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৯৩)
আরেকটি সহজ জিকির হলো ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার এই তাসবিহ পাঠ করবে, তার ছোটখাটো পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়ে ওঠে না। অথচ তাদের খোঁজ নেওয়া, দেখা করা কিংবা প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ আমল।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং আয়ু দীর্ঘ হওয়ার আশা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৫)
তাই ব্যস্ততার মধ্যেও বাবা-মা, ভাই-বোন ও অন্যান্য আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের খোঁজ নেওয়া একটি সহজ কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ আমল।
চার আমল একদিনে
একটি হাদিসে এমন চারটি আমলের কথা এসেছে, যেগুলো একই দিনে একত্র হওয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এগুলো হলো—নফল রোজা রাখা, জানাজার নামাজে অংশ নেওয়া, কোনো দরিদ্র বা অসহায় ব্যক্তিকে খাবার দেওয়া এবং অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তির মধ্যে একদিনে এই চারটি কাজ একত্র হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২৮)
চাশতের দুই রাকাত নামাজ
মানুষের শরীরের প্রতিটি জোড়ার জন্য প্রতিদিন একটি করে সদকা করার কথা হাদিসে এসেছে। তবে এই সদকার দায়িত্ব আদায়ের পথও সহজ করে দেওয়া হয়েছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ বলা একটি করে সদকা। ভালো কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখাও সদকা। আর সকালে চাশতের দুই রাকাত নামাজ আদায় করলে শরীরের প্রতিটি জোড়ার পক্ষ থেকে এসব সদকার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭২০)
প্রতিটি অক্ষরে নেকি
কোরআন তিলাওয়াত এমন একটি আমল, যার প্রতিটি অক্ষরের জন্যও সওয়াবের কথা হাদিসে এসেছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কিতাব থেকে একটি অক্ষর পাঠ করলে একটি নেকি পাওয়া যায় এবং প্রতিটি নেকির প্রতিদান ১০ গুণ। তিনি বলেন, ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি অক্ষর নয়; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০)
তাই প্রতিদিন দীর্ঘ সময় না পেলেও কয়েক আয়াত কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস করা যেতে পারে। সম্ভব হলে অর্থ বুঝে পড়লে তা আত্মিক উপলব্ধির ক্ষেত্রেও আরও অর্থবহ হতে পারে।
ছোট আমলকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। নিয়মিত নামাজ, জিকির, কোরআন তিলাওয়াত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কিংবা অসুস্থ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাজগুলো দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নেওয়া যায়। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, আন্তরিকতার সঙ্গে করা এমন ছোট কাজও আল্লাহর কাছে বড় মর্যাদা পেতে পারে।