বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের আরবান ডিজাইন অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ ডিভিশনের অধীনে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে 'মাস্টার অব ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার (এমএলএ)' প্রোগ্রাম। আসন্ন সেমিস্টার থেকেই স্থপতি বা ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রীধারীদের জন্য স্টুডিও-ভিত্তিক দুইবছর মেয়াদী এই স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে। ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে কিছুদিনের মধ্যেই।
সম্প্রতি বুয়েটের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল নতুন এই স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে, যা দেশের স্থাপত্য শিক্ষা ও চর্চার ক্ষেত্রে নতুন এক মাইলফলক।
প্রথাগত স্থাপত্যচর্চায় দালানকোঠার কাঠামোগত বিন্যাস প্রাধান্য পেলেও ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচারে অগ্রাধিকার পায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধন। ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্টদের কাজ হলো— প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করে কোনো উন্মুক্ত স্থান বা পার্ক, প্লাজা, খেলার মাঠ, নদী ও লেকের পাড় বাঁধাই, জলাধার সংরক্ষণ এবং ভবন সংলগ্ন চত্বর বা ছাদবাগানের নান্দনিক নকশা প্রণয়ন করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও নগর এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করার বিষয়গুলোও ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচারে অন্তর্ভুক্ত। সুপরিকল্পিত সবুজ ও উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; এবং প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা তৈরি করে।
বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার শিক্ষাকে বিশেষায়িত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর তা পূর্ণাঙ্গ এমএলএ প্রোগ্রামে রূপ নিয়েছে। বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই 'মাস্টার অব ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার' প্রোগ্রামটি যেন উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত চর্চার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যে স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষকরা কাজ করছেন। স্টুডিও-ভিত্তিক ডিজাইন কোর্সের পাশাপাশি সমালোচনামূলক গবেষণা ও তাত্ত্বিক কোর্সের সমন্বয়ে প্রোগ্রামটি সাজানো হয়েছে। স্থাপত্য বিভাগ এখন এমএলএ প্রোগ্রামের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
নতুন এই মাস্টার্স প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর (সমন্বয়ক) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলিয়া শাহেদকে। তিনি ২০১৬ সালে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ থেকে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সম্মানজনক 'Justus & Louise van Effen Excellence Scholarship' নিয়ে নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত টিইউ ডেল্ফ্ট (TU Delft) বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান এবং ২০২০ সালে ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচারে ডিস্টিংশনসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সেদেশে কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরে ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচারের প্রসার ও শিক্ষায় অবদান রাখাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।
স্থপতি আলিয়া শাহেদ বলেন, 'দেশে শহরগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু সে তুলনায় সংবেদনশীলভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে না। ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচারে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও চর্চার পরিধি এখনো সীমিত। টিইউ ডেল্ফ্টে পড়তে যাওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল আমি যেন দেশে ফিরে সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। সেই স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, পাশাপাশি এমএলএ প্রোগ্রামের সমন্বয়কের দায়িত্ব পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত।'
বুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন এবং আরবান ডিজাইন অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ (ইউডিএল) ডিভিশনের কো-অর্ডিনেটর স্থপতি অধ্যাপক ড. নাসরিন হোসেন বলেন, 'আসন্ন সেমিস্টার থেকে মাস্টার অব ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। ইউডিএল ডিভিশনের সব সদস্য এই ডিগ্রির পাঠ্যক্রম তৈরিতে গত এক দশক ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আশা করি এই প্রোগ্রামটি দেশে ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার চর্চায় নতুনত্বের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবে।'