শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মোবাইল-অনলাইন আসক্তি এবং কারিকুলাম পরিবর্তনকে চলতি বছরের দাখিলে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ২২৬ মাদ্রাসার প্রধানরা। তবে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা এসব যুক্তি মানতে নারাজ। বোর্ডের তদন্তে উঠে এসেছে, ২২৬ মাদ্রাসায় শতভাগ ফেল করার নেপথ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনাসংক্রান্ত ব্যর্থতা, একাডেমিক নজরদারির চরম ঘাটতি এবং দায়িত্বশীলতার অভাব। আগে টেস্ট পরীক্ষার পর বিনা মূল্যে কোচিং, অতিরিক্ত ক্লাস ও বাড়তি নজরদারি করা হতো, এবার ছিল না সেই উদ্যোগ। কোথাও শিক্ষার্থী এক থেকে পাঁচ জন, তা-ও অনিয়মিত। ২২৬ মাদ্রাসার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে আরবি বিষয়ে, এরপর ইংরেজি ও গণিতে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘২২৬ মাদ্রাসার প্রধানরা শতভাগ ফেলের কারণ হিসেবে যে যুক্তি তুলে ধরেছেন, তাতে বোর্ড সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই শিক্ষার্থী খুবই কম, পড়ালেখাও তেমন হয় না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বোর্ডের পক্ষ থেকে লিখিত সুপারিশ শিগিগরই মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।’ ফল প্রকাশের পরদিন গত ১১ আগস্ট এই ২২৬ মাদ্রাসার প্রধানকে শোচনীয় ফলের পেছনে লিখিত বক্তব্যসহ বোর্ডে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ২৩ আগস্টের মধ্যে এসব মাদ্রাসার প্রধানরা বোর্ডে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
শূন্য পাশ মাদ্রাসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তরাঞ্চলে :শূন্য পাশ ২২৬ মাদ্রাসার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শূন্য পাশ মাদ্রাসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তরাঞ্চলে। এর মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলে ৭৪টি, রংপুরে ৪১টি, বরিশাল ও ঢাকায় ২৯টি করে, খুলনায় ২৭টি, ময়মনসিংহে ১৮টি, কুমিল্লায় সাতটি এবং চট্টগ্রামে একটি। সিলেট অঞ্চলে একটি মাদ্রাসাও শূন্য পাশের তালিকায় নেই। সূত্র জানায়, শিক্ষাসূচক ও শিক্ষার গুণমান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিগিগরই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে বোর্ড।
মাদ্রাসাপ্রধানদের লিখিত বক্তব্যের বাইরে মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদসহ কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। লিখিত বক্তব্যের বাইরে নানা প্রশ্ন করেন তারা। সেখানে উঠে আসে আরো কিছু কারণ। কয়েকজন মাদ্রাসাপ্রধান জানান, মফস্সল ও দুর্গম এলাকার পৃষ্ঠা ২ কলাম ৩
খারাপ ফলের পেছনে
১৬ পৃষ্ঠার পর
অনেক মাদ্রাসা ভালো শিক্ষার্থী পায় না। কোথাও শিক্ষার্থী এক জন, আবার কোথাও দুই থেকে পাঁচ জন, তা-ও অনিয়মিত। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক শিক্ষক পলাতক, কেউ কারাগারে আছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, পরবর্তী সময়ে শিক্ষকসংকট, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব এবং শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলন ও পড়াশোনার বাইরে ব্যস্ত হয়ে পড়াকেও দায়ী করেছেন শিক্ষকদের কেউ কেউ। এছাড়া নকল ঠেকাতে কড়াকড়ি, সিসিটিভি নজরদারি ও খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়নের কারণেও এবার ফেলের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করেন তারা।
আরবি বিষয়ে ফেল নিয়ে প্রশ্ন :মাদ্রাসাপ্রধানদের এসব ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদ। তিনি বলেন, কারিকুলাম পরিবর্তন বা মোবাইল আসক্তি যদি বড় কারণ হয়, তাহলে সাধারণ স্কুলের ফলেও একই প্রভাব থাকার কথা। আর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা আরবি বিষয়ে ফেল করবে কেন? তিনি আরো বলেন, শূন্য পাশ মাদ্রাসার প্রায় অর্ধেকই পুরোনো প্রতিষ্ঠান।