মাথার পেছনে থেঁতলানো, নাক-মুখে রক্তের দাগ, ঘটনার হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিলেন সেই শিক্ষিকার স্বামী

দৃষ্টিশক্তির জটিলতা সারাতে স্বামীর হাত ধরে দূরপাল্লার বাসে করে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিনা পারভীন (৫৫)। গন্তব্য ছিল খামারবাড়ির চক্ষু হাসপাতাল; কিন্তু হাসপাতালের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর আগেই রাজপথের নির্মম ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে লাশ হতে হলো তাকে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার কাছে চলন্ত রিকশা থেকে ছিনতাইকারীর ব্যাগের টানে ছিটকে পড়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংসদ ভবনের ১২ নম্বর বকুলতলা গেট সংলগ্ন সড়কে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।

এদিন দুপুরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে স্ত্রীর মরদেহের ময়নাতদন্তের অপেক্ষায় ছিলেন আবদুল মতিন। তার পরনে ছিল সাদা পায়জামা, যাতে তখনও রক্তের ছোপ ছোপ দাগ ছিল। আশপাশে ছিলেন ৮-১০ জন স্বজন। সেখানেই তিনি স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা দেন।

রনজিনার স্বামী আবদুল মতিন জানান, শুক্রবার রাতে তারা বাসে করে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। শনিবার ভোরে রাজধানীর কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে নামার পর সকাল ৬টার দিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে খামারবাড়ির ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। অটোরিকশাটি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল।

মতিন বলেন, সংসদের ১২ নম্বর বকুলতলার গেট পার হওয়ার পর একটি মোটরসাইকেল তাদের রিকশার পাশে এসে চলতে থাকে। মোটরসাইকেলটি দুবার রিকশার গায়ে ঘষা দিলে তিনি প্রতিবাদ করেন। এরপর রিকশাচালক গতি কমিয়ে দেন।

‘সেই সময় পেছন থেকে মোটরসাইকেলে থাকা ব্যক্তি আমার স্ত্রীর কাঁধে থাকা ব্যাগ ধরে সজোরে টান দেয়। ছিনতাইকারী ব্যাগ নিয়ে খামারবাড়ির দিকে চলে যায়। আর হেঁচকা টানে আমার স্ত্রী রিকশা থেকে উল্টে সড়কে পড়ে যান।’

তিনি জানান, রনজিনার মাথা সড়কের নিচের দিকে পড়ে যায় এবং রিকশাটি সামনের দিকে চলে যায়। স্ত্রীকে পড়ে যেতে দেখে তিনি রিকশা থামিয়ে পেছনে দৌড়ে যান। গিয়ে দেখেন, রনজিনা রক্তাক্ত অবস্থায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছেন।

মতিনের ভাষ্য, স্ত্রীর মাথার পেছন থেকে রক্ত গড়িয়ে তার পাঞ্জাবি ও পায়জামা ভিজে যায়। তিনি পাঞ্জাবি খুলে রনজিনার মাথার পেছনে চেপে ধরেন। পরে তাকে কোলে তুলে একই রিকশায় করে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রনজিনাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রনজিনা পারভীনের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দড়ি সোনাকানিয়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের ময়েজ উদ্দিনের মেয়ে। তার শ্বশুরবাড়ি গাবতলী সদর ইউনিয়নের তরফসরতাজ গ্রামে। বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় স্বামী ও একমাত্র মেয়ে রাইসাকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। রাইসা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রনজিনার স্বামী আবদুল মতিন বগুড়া নিউ মার্কেটে কাপড়ের ব্যবসা করেন।

ঘটনার পর রনজিনার মরদেহের সুরতহাল করেন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই জাহিদুল আলম। সুরতহাল প্রতিবেদনে মাথার পেছনে থেঁতলানো জখম এবং নাক-মুখে রক্তের দাগ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এসআই জাহিদুল ইসলাম বলেন, মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে।

রনজিনার মরদেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান জাহিদুল ইসলাম। রবিবার বাদ জোহর পারিবারিক গোরস্থানে তার দাফন হওয়ার কথা রয়েছে।

এই ঘটনায় শুধু রনজিনার পরিবারই নয়, শোক নেমে এসেছে তার কর্মস্থল ও পুরো এলাকায়। সহকর্মী, শিক্ষার্থী, আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।