প্রথম মুসলিম নারী নার্স, নবী (সা.) যোদ্ধার সমান মর্যাদা দিয়েছিলেন যাকে

ইসলামের প্রথম নার্স ছিলেন নারী সাহাবি রুফাইদাহ আল-আসলামিয়া। তিনি বানু খাজরাযের আসলাম গোত্রের সদস্য ছিলেন। এ সাহাবিয়্যা রাসূল (সা.)-এর মদিনায় আগমনের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। রুফাইদাহ আল-আসলামিয়াকে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সেবিকা বা নার্স হিসেবে সম্মান করা হয়।

 বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

সপ্তম শতকে মদিনায় মসজিদে নববীর পাশে একটি সাধারণ তাঁবুতে অসুস্থ ও আহত মানুষের সেবা করতেন রুফাইদাহ। ক্ষত পরিষ্কার করা, ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া, রোগীদের যত্ন নেওয়া এবং তাদের মানসিকভাবে সাহস জোগানো ছিল তার দৈনন্দিন কাজ।

জানা যায়, রুফাইদাকে নিয়ে গবেষণা করেছেন মুস্তাফা এম. বৌদ্রাক, মুতলাক বি. আল-মুতাইরি, ফাতিমা এস. আল-সুলামী এবং হিশাম এম. আল-ফায়াদ। তাদের গবেষণার তথ্য সৌদি সরকারের গেজেট ও অন্যান্য তথ্য এবং ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, খাজরাজ গোত্রের বনু আসলাম শাখায় জন্ম নেওয়া রুফাইদাহ একজন চিকিৎসকের কন্যা ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মদিনায় একটি চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে প্রথম চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

যুদ্ধের সময় আহত সাহাবিদের চিকিৎসার জন্য ‘খাইমাহ আল-রুফাইদাহ’ নামে একটি ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রও গড়ে তোলেন তিনি। বদর, উহুদ, খন্দক ও খায়বারের যুদ্ধে আহতদের সেবায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জানা যায়, মদিনার আনসার-মুহাজিরদের অন্যান্য নারী সাহাবিদের তিনি নার্সিং প্রশিক্ষণ দেন। তার শিষ্য নারী সাহাবিরা বদর, উহুদ, খন্দক ও খায়বারসহ অন্যান্য জিহাদ-সংগ্রামগুলোতে অংশগ্রহণ করে আহতদের চিকিৎসাসেবা দান করতেন।

রাসূল (সা.) খায়বারের যুদ্ধে যাবার জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন রুফাইদা (রা.) ও একদল স্বেচ্ছাসেবী নার্স (নারী সাহাবি) তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চাই। আহতদের সেবা করার পাশাপাশি মুসলিমদের যতটুকু সম্ভব সাহায্যের চেষ্টা করবো। রাসূলুল্লাহ (সা.) অনুমতি দিলেন। কেউ আহত হলে তিনি তাকে রুফাইদার তাবুতে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি ও তার স্বেচ্ছাসেবী ‘নার্স বাহিনী’ খুবই চমৎকারভাবে এ কাজ সম্পন্ন করেন। ফলে খুশি হয়ে রাসূল (সা.) খায়বার-যুদ্ধের গনিমতের একটা অংশ রুফাইদা (রা.)-এর জন্য বরাদ্দ করেন। তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমদের সমান মর্যাদা (গনিমত) দেওয়া হয়েছিল।

রুফাইদাহ শুধু চিকিৎসক বা সেবিকা ছিলেন না, তিনি মানবসেবা, মমতা ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন দক্ষ সংগঠকও। নারীদের চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি একটি সেবিকা দল গড়ে তুলেছিলেন। তার নেতৃত্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা যুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের সেবা দিতেন। 

অনেক গবেষকের মতে, এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সেবিকা বা নার্স প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। 

যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবায় নিয়োজিত এসব নারীকে দেখে মহানবী (সা.) এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তিনি তাদের যোদ্ধাদের সমান গণিমতের অংশ প্রদান করেছিলেন। এটি ছিল তাদের অবদানের বিশেষ স্বীকৃতি।

জানা যায়, ইসলামের ইতিহাসে এটি ছিল নারীদের সেবাকর্মের বিরল স্বীকৃতি।
 
রুফাইদাহ দরিদ্র, এতিম, শিশু ও অসহায় মানুষের চিকিৎসায় বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি নিজের সম্পদ ব্যয় করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও করেছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদ তাকে বিশ্বের প্রথম ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা ও মানবিক চিকিৎসা কার্যক্রমের পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আজও তার মানবসেবা, চিকিৎসা ও ত্যাগের অনন্য অবদান বিশ্বজুড়ে স্মরণ করা হয়। বিভিন্ন দেশে তার নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেবাখাতে বিশেষ অবদানের জন্য প্রতিবছর তার নামাঙ্কিত পুরস্কারও দেওয়া হয়।