প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঞ্চনার ৮৫ বছর, চলছে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার লোচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৮৫ বছরেও নির্মাণ হয়নি স্থায়ী ভবন। ফলে খোলা আকাশের নিচে কিংবা একটি ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে পাঠদান করতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। কাঠফাটা রোদ ও ভ্যাপসা গরমে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪১ সালে শাহজাদপুর উপজেলার ১৩ নম্বর জালালপুর ইউনিয়নের লোচনাপাড়া এলাকায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ চারজন শিক্ষক শতাধিক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। বিদ্যালয়ে একটি কক্ষ থাকায় সেখানেই অফিস ও শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। নেই কোনো সীমানাপ্রাচীরও।

স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালে বিদ্যালয়ের জন্য দ্বিতল পাকা ভবন নির্মাণের বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশে বিদ্যালয়ের পুরোনো টিনের ঘর নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে ভবন নির্মাণের সরঞ্জাম পরিবহনের উপযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শুরু করেনি।

ফলে বর্তমানে শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একই কক্ষে অফিস ও একাধিক শ্রেণির পাঠদান চলছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভালো হলেও উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় দিন দিন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অনেকে দূরের বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, আবার কেউ কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে বলেও জানান স্থানীয়রা।

লোচনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুক্তি খাতুন বলেন, তার ছেলে ফুয়াদ হোসেন বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের ক্লাস হয় শিক্ষকদের অফিসকক্ষে। একই কক্ষে তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসও নেওয়া হয়। এতে ছোট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ছোট সন্তান নিয়ে দূরের বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় বাধ্য হয়ে এখানেই সন্তানকে পড়াচ্ছেন তিনি।

একই গ্রামের বাসিন্দা উর্মি খাতুন বলেন, তার এক ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে এবং আরেক ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান ভালো এবং শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর বৃত্তি পায়। তবে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। ছাপড়া ঘরের চারপাশে কোনো বেড়া নেই। বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীরা ভিজে যায়, আবার প্রচণ্ড গরমে ক্লাস করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ছেলেদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার কথা ভাবছেন তিনি।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান ভালো। শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর বৃত্তি পেয়ে আসছে। তবে শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্টদের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও কোনো সুফল পাইনি। এ পরিস্থিতিতে প্রতিবছরই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমে যাচ্ছে।’

শাহজাদপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের দুর্ভোগের চিত্র দেখে এসেছি। লোচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যেই কাজ শুরু হবে।’