দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন কারণে কারও ওপর গোসল ফরজ হতে পারে। এ অবস্থায় কারও সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেওয়া বা সালামের জবাব দেওয়া যাবে কি না-এ নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, গোসল ফরজ থাকা অবস্থায় সালাম দেওয়া জায়েজ এবং কেউ সালাম দিলে তার জবাব দেওয়াও ওয়াজিব।
গোসল ফরজ থাকা অবস্থায় নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত এবং মসজিদে অবস্থানের মতো কিছু নির্দিষ্ট আমল করা নিষিদ্ধ। তবে সাধারণ জিকির, দোয়া ও সালাম বিনিময়ে কোনো বাধা নেই।
গোসল ফরজ অবস্থায় জিকির ও সালাম
এ বিষয়ে সাহাবি ও তাবেঈদের বিভিন্ন বক্তব্য ও বর্ণনা রয়েছে। ইমাম জুহরি (রহ.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যার ওপর গোসল ফরজ হয়েছে, সে আল্লাহর জিকির করতে পারবে; তবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারবে না। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, ১২৫৮)
তাবেঈ ইবরাহিম নাখঈ (রহ.)-এর বর্ণনাতেও একই ধরনের মত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, গোসল ফরজ হওয়া ব্যক্তি আল্লাহর জিকির ও ‘বিসমিল্লাহ’ পড়তে পারবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, ১২৫৯)
অর্থাৎ, দৈহিক পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল ফরজ থাকলেও আল্লাহর জিকির, দোয়া কিংবা সালাম আদান-প্রদানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
‘মুমিন অপবিত্র হয় না’
গোসল ফরজ থাকা মানেই একজন মুমিন ব্যক্তি নিজে অপবিত্র—বিষয়টি এমন নয়। এ বিষয়ে হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর একটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার মদিনার একটি পথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তখন তিনি জুনুব অবস্থায় ছিলেন। এ কারণে তিনি সরে গিয়ে গোসল করে পরে নবীজি (সা.)-এর কাছে ফিরে আসেন।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে আবু হুরায়রা! তুমি কোথায় ছিলে?’ তিনি জানান, তিনি জুনুব অবস্থায় ছিলেন এবং পবিত্রতা ছাড়া নবীজির সঙ্গে বসতে অপছন্দ করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সুবহানাল্লাহ! মুমিন অপবিত্র হয় না।’ (সহিহ বুখারি, ২৮৩; সহিহ মুসলিম, ৭১০)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, গোসল ফরজ থাকা মূলত শরিয়ত নির্ধারিত একটি অপবিত্রতার অবস্থা; এতে মুমিন ব্যক্তির মর্যাদা বা সত্তা অপবিত্র হয়ে যায় না।
গোসল ফরজ হলে দেরি করা যাবে?
গোসল ফরজ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পবিত্রতা অর্জন করা উত্তম। অযথা গোসল বিলম্ব করা উচিত নয়। বিশেষ করে গোসল করতে দেরি করার কারণে যদি ফরজ বা ওয়াজিব নামাজের সময় পার হয়ে যায়, তাহলে তা গুনাহের কারণ হবে।
তবে নামাজের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে কিছু সময় পরে গোসল করায় গুনাহ হয় না। কোনো কারণে তাৎক্ষণিকভাবে গোসল করা সম্ভব না হলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধুয়ে ওজু করে নেওয়া সুন্নাহসম্মত বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন।
যেসব কারণে গোসল ফরজ হয়
ইসলামি শরিয়তে বিভিন্ন কারণে গোসল ফরজ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- উত্তেজনার সঙ্গে বীর্যপাত: জাগ্রত বা ঘুমন্ত অবস্থায় কামভাব ও উত্তেজনার সঙ্গে বীর্যপাত হলে গোসল ফরজ হয়।
- স্বপ্নদোষ: ঘুম থেকে ওঠার পর বীর্যের চিহ্ন বা আর্দ্রতা পাওয়া গেলে গোসল ফরজ হয়।
- স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক মিলন: বীর্যপাত না হলেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌনমিলন হলে উভয়ের ওপর গোসল ফরজ হয়।
- ঋতুস্রাব (হায়েজ): নারীর মাসিকের রক্তস্রাব সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পর গোসল করে পবিত্র হতে হয়।
- নেফাস: সন্তান প্রসবের পর রক্তস্রাব পুরোপুরি বন্ধ হলে গোসল করে পবিত্র হওয়া আবশ্যক।
সুতরাং, গোসল ফরজ থাকা অবস্থায় সালাম দেওয়া যায় এবং সালামের জবাবও দিতে হয়। তবে নামাজসহ যেসব ইবাদতের জন্য পবিত্রতা শর্ত, সেগুলো পালনের আগে অবশ্যই শরিয়তসম্মতভাবে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।