নিরাপদ পোলট্রি ব্যতীত আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষা হইবে কি?

ব্রয়লার মুরগি বহু দিন ধরিয়াই বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ । তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাণিজ আমিষের জোগান নিশ্চিত করিতে পোলট্রি শিল্পের অবদানও অনস্বীকার্য; কিন্তু এই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের সহিত যদি খাদ্যনিরাপত্তা, প্রাণিস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব না পায়, তাহা হইলে সস্তা আমিষের আড়ালে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হইতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের কর্মশালায় উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি করিবার যেই তাগিদ উঠিয়াছে, তাহা তাই সময়োপযোগী । বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হইল, ব্রয়লার খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার। ইতিপূর্বে ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গিয়াছে, প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক খামারি রোগ দেখা দেওয়ার পূর্বেই সুস্থ মুরগিকে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক দেন। কেহ কেহ আবার ডিলারের পরামর্শকেই চিকিৎসকের পরামর্শ হিসাবে গ্রহণ করেন । অথচ অ্যান্টিবায়োটিক রোগপ্রতিরোধের সাধারণ টনিক নহে । অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াকে ধীরে ধীরে ঔষধ-প্রতিরোধী করিয়া তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ঔষধ-প্রতিরোধী সংক্রমণের কারণে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হইয়াছে। সুতরাং বিষয়টি কেবল মুরগির মাংসে ঔষধের অবশিষ্টাংশ থাকিবে কি না, তাহার মধ্যে সীমাবদ্ধ নহে। ইহার সহিত ভবিষ্যৎ চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতাও জড়িত ।

তবে এই বিষয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করাও সমাধান নহে। অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ও অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি এক বিষয় নহে। অসুস্থ প্রাণীর যথাযথ চিকিৎসায় প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সুযোগ থাকিবেই। গুরুত্বপূর্ণ হইল, তাহা যেন ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শে, সঠিক মাত্রায় এবং নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ব্যবহৃত হয় । ইহার পাশাপাশি চিকিৎসার পর নির্দিষ্ট 'উইথড্রয়াল পিরিয়ড' মানিয়া চলিতে হইবে, যাহাতে মাংসে ঔষধের অবশিষ্টাংশ থাকার ঝুঁকি কমে। প্রতিবেদনে দেখা গিয়াছে, দায়িত্বশীল চুক্তিভিত্তিক খামারগুলিতে এই নিয়ম মানার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে ভালো । ইহা প্রমাণ করে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও তদারকি থাকিলে নিরাপদ উৎপাদন সম্ভব ।

সমস্যার আরেকটি দিক অর্থনৈতিক। অনেক প্রান্তিক খামারি বাচ্চা, খাদ্য ও ঔষধের জন্য ডিলারের উপর নির্ভরশীল এবং ঋণগ্রস্ত। ফলে যিনি ঔষধ বিক্রি করিতেছেন, তিনিই যখন ঔষধ ব্যবহারের পরামর্শ দেন, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়া স্বাভাবিক । খামারির অজ্ঞতাকে পুঁজি করিয়া অপ্রয়োজনীয় ঔষধ বিক্রি বন্ধ করিতে হইবে। ডিলারদের জন্যও প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ও জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন। ইহার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহজলভ্য সরকারি বা অনুমোদিত প্রাণিচিকিৎসা-পরামর্শ নিশ্চিত করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে ‘বায়োসিকিউরিটি’ বা জৈব-নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচ্য। পরিচ্ছন্ন খামার, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা, হাত-পা পরিষ্কার রাখা, জীবাণুনাশক ব্যবহার এবং অসুস্থ মুরগিকে পৃথক রাখার মতো ব্যবস্থা অনেক রোগের ঝুঁকি কমাইতে পারে। অর্থাৎ রোগ হওয়ার পর অ্যান্টিবায়োটিকের দিকে ছুটিয়া যাওয়ার পরিবর্তে রোগ-প্রতিরোধের পরিবেশ তৈরি করাই অধিক কার্যকর এবং দীর্ঘ মেয়াদে অধিক সাশ্রয়ী।
এই জন্য খামার হইতে ফিড মিল, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং খুচরা বাজার পর্যন্ত একটি কার্যকর নজরদারি-শৃঙ্খল গড়িয়া তোলা জরুরি। নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নথিভুক্তকরণ এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন । ইহার পাশাপাশি জীবন্ত মুরগি বিক্রির অস্বাস্থ্যকর বাজারব্যবস্থা ধাপে ধাপে কমাইয়া আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে । মনে রাখিতে হইবে, নিরাপদ খাদ্য কেবল ভোক্তার অধিকার নহে, ইহা রাষ্ট্রের দায়িত্বও । খামারিকে দোষারোপ করিয়া সমস্যার সমাধান হইবে না । তাহাকে জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা-পরামর্শ ও ন্যায্য বাজারব্যবস্থা দিতে হইবে । আর ভোক্তাকেও সস্তার প্রতিযোগিতার বাইরে খাদ্যের নিরাপত্তার প্রশ্নটি দেখিতে হইবে । একটি মুরগিকে এখন অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত হয়তো ছোট বলিয়া মনে হইতে পারে; কিন্তু লক্ষ লক্ষ খামারে একই সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ মূল্য দিতে হইতে পারে । নিরাপদ পোলট্রি শিল্প তাই কেবল শিল্পের স্বার্থ নহে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যরক্ষারও অপরিহার্য শর্ত