দ্রুত বিয়ে হওয়ার জন্য ১১টি করণীয় আমল

বিয়ে হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি বিষয়। কিন্তু সমাজের নিদারুণ নিয়ম তন্ত্রের মধ্যে পড়ে অনেক যুবক-যুবতি ঠিক সময়ে বিয়ে করতে পারে না। ফলে তারা মনোকষ্টে ভোগে। আবার কেউ কেউ বিয়ে করতে চাইলেও পছন্দ মতো পাত্র কিংবা পাত্রী না পাওয়ায় বিয়ে হয় না। বিয়ে করা যুবক-যুবতীদের জন্য ক্ষেত্র ভেদে ফরজ আবার কখনও সুন্নত।

বস্তুত জীবনে বিয়ের গুরুত্ব কী বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ তাআলা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর হজরত হাওয়া (আ.)-কে তার জীবনসাথিরূপে সৃষ্টি করেন। তাদের বিয়ের মাধ্যমে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো পৃথিবীতে চলমান।

পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর তাঁর (আল্লাহ) নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও মায়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম, আয়াত : ২১)

বাস্তব জীবনে বহু সময় আন্তরিক দোয়া ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিয়েতে বিলম্ব ঘটে। এই বিলম্ব অনেককে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে, হতাশ করে তোলে। কিন্তু মুমিনের পরিচয় হলো, সে হতাশ হয় না, বরং মহান আল্লাহর দিকে আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে যায়, আমল ও চেষ্টা জোরদার করে। দ্রুত বিয়ের জন্য কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও করণীয় উল্লেখ করা হলো-

ইস্তেগফারে অভ্যস্ত হওয়া: ইস্তেগফার কেবল গুনাহ মাফের মাধ্যম নয়, বরং এটি রিজিক, প্রশান্তি ও জীবনের জটিলতা সহজ করার চাবিকাঠি। মহান আল্লাহ কোরআনে হজরত নুহ (আ.)-এর ভাষায় বলেন, ইস্তেগফার করলে আকাশ থেকে বারিধারা নেমে আসে, ধন-সম্পদ ও সন্তান দান করা হয়। (সুরা নুহ ১০-১২) বিয়ের বিলম্বও অনেক সময় আমাদের অজানা গুনাহের ফল হতে পারে। তাই চলাফেরা, কাজকর্ম, ওঠা-বসাসহ সব অবস্থায় ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জারি রাখা উচিত। অন্তর থেকে তওবা করে ইস্তেগফার করলে মহান আল্লাহ অচিরেই রাস্তা খুলে দেন।

নেক জীবনসঙ্গীর দোয়া পড়া: বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জীবনসঙ্গী যেন দ্বীনদার ও তাকওয়াবান হয়। এ জন্য কোরআনের শেখানো দোয়ার বিকল্প নেই। বিশেষভাবে সুরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতটি গভীর মনোযোগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে পড়া উচিত, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ করুন।’ এই দোয়া কেবল বিয়ের জন্য নয়, বরং একটি সুখী ও দ্বীনদার পরিবার গঠনের জন্য অমূল্য।

নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দোয়া করা: দোয়ার অন্যতম আদব হলো, নিজের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজন মহান আল্লাহর সামনে তুলে ধরা। হজরত মুসা (আ.)-এর একটি সংক্ষিপ্ত দোয়া আজও মুমিনের হৃদয় নাড়া দেয়। সুরা কাসাসের ২৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।’ এই দোয়া পাঠের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর কাছে স্বীকার করে, হে আল্লাহ, আমার কোনো শক্তি নেই, আপনার দয়াই আমার একমাত্র ভরসা।

দোয়া কবুলের সময়গুলো কাজে লাগানো: সবসময় দোয়া কবুল হলেও কিছু মুহূর্ত আছে, যখন দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বেশি। যেমন সেজদার সময়, ফরজ নামাজের পর, ফজরের পূর্ব মুহূর্ত, জুমার দিনের বিশেষ ক্ষণ। এসব সময়ে বিয়ের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করা উচিত। দোয়া যেন কেবল মুখের কথা না হয়, বরং চোখের পানি ও অন্তরের আকুতি নিয়ে হয়।

হালাল পন্থায় বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ: ইসলাম কেবল দোয়ার শিক্ষা দেয় না, বরং দোয়ার সঙ্গে প্রচেষ্টাকেও অপরিহার্য করেছে। তাই আমল ও দোয়ার পাশাপাশি হালাল ও শালীন পন্থায় পাত্র বা পাত্রীর সন্ধান চালু রাখা জরুরি। বিশ্বস্ত আত্মীয়, অভিভাবক ও দ্বীনদার মানুষের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। শুধু ‘দোয়া করছি’, এটুকু বলে বসে থাকলে চলবে না।

রুকইয়ার প্রতি মনোযোগ: কখনো কখনো হিংসা, কু-নজর বা জাদুর কারণেও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাধা আসে। যদি এমন আশঙ্কা থাকে, তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসভিত্তিক রুকইয়া করা যেতে পারে। সুরা ফাতেহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ফালাক ও নাস নিয়মিত পড়া, এগুলো আত্মিক সুরক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম।

নিয়মিত সদকা করা: সদকা বিপদাপদ দূর করে এবং মহান আল্লাহর রহমত ডেকে আনে। অল্প হলেও নিয়মিত সদকা করলে মহান আল্লাহ অদৃশ্য উৎস থেকে সাহায্য করেন। বিয়ের জন্য সদকা করার নিয়ত করলে তা ইনশাআল্লাহ কল্যাণ বয়ে আনে।

অন্য মুসলিমের জন্য বিয়ের দোয়া: নিঃস্বার্থ দোয়ার শক্তি অসাধারণ। অন্য কোনো ভাই বা বোনের জন্য আন্তরিকভাবে বিয়ের দোয়া করলে ফেরেশতারা বলেন, ‘আমিন, তোমার জন্যও অনুরূপ।’ এভাবে নিজের জন্যও কল্যাণের দরজা খুলে যায়।

মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন: মা-বাবার দোয়া মহান আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ, সম্মান ও খেদমত করলে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। অনেক সময় বিয়ের বিলম্বের পেছনে মা-বাবার কষ্ট বা অসন্তুষ্টি কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এ বিষয়েও আত্মসমালোচনা জরুরি।

সংযম ও রোজার গুরুত্ব: যদি দোয়া ও চেষ্টা সত্ত্বেও বিয়ের ব্যবস্থা না হয় এবং নফসের চাপ বাড়ে, তবে রোজা রাখাকে অভ্যাসে পরিণত করা উচিত। দৃষ্টি সংযত রাখা, নিজেকে উপকারী কাজে ব্যস্ত রাখা ও জিকিরে মশগুল থাকা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিস অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি যুবসমাজকে বিয়ের সামর্থ্য থাকলে বিয়ে করার এবং না থাকলে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যা নফসের জন্য ঢালস্বরূপ।

মুমিনের করণীয়: বিয়ের বিলম্ব কোনো অভিশাপ নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা বা কল্যাণের পূর্বপ্রস্তুতি হতে পারে। একজন মুমিনের করণীয় হলো, হতাশ না হয়ে ইস্তেগফার, দোয়া, সদকা, সংযম ও বাস্তব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। মহান আল্লাহ সময়মতো সর্বোত্তম ব্যবস্থা করেন, এই বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।