এআইয়ের পরামর্শে পাহাড়ে গিয়ে বিপদে তিন তরুণ, রাত কাটাতে হলো গিরিখাতে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর অতিরিক্ত ভরসা করে বিপদে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার তিন পর্বতারোহী। গুগলের এআই চ্যাটবট জেমিনির পরামর্শ নিয়ে মাউন্ট শাস্তা জয় করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে পথ হারিয়ে দুর্গম একটি গিরিখাতে রাত কাটাতে হয়েছে তাদের।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

জানা যায়, উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় পাহাড় থেকে নামানো হয় তিনজনকে। পথ হারিয়ে একজন আহতও হন। ক্যালিফোর্নিয়ার রোজভিলের বাসিন্দা ওই তিন তরুণই ছিলেন অনভিজ্ঞ পর্বতারোহী।

এর আগে, গত ২৯ আগস্ট তারা মাউন্ট শাস্তার ক্লিয়ার ক্রিক ট্রেইলহেড থেকে যাত্রা শুরু করেন। প্রায় আট ঘণ্টার মধ্যে অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এই পরিকল্পনায় তারা গুগল জেমিনি, ইউটিউব ও অলট্রেইলসের সহায়তা নিয়েছিলেন।

পরদিন ভোর ৩টার দিকে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতায় তৈরি করা ক্যাম্প থেকে চূড়ার উদ্দেশে রওনা দেন তারা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগে তাদের।

শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা মাউন্ট শাস্তার চূড়ায় পৌঁছান। অথচ নিরাপত্তার কারণে দুপুর ১২টার মধ্যে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

এতে দিনের আলো থাকতে পাহাড় থেকে নিরাপদে নেমে আসার সুযোগ থাকে। কিন্তু ওই তিন তরুণ জেমিনাইয়ের পরামর্শ মেনে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও চূড়ার দিকে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা সাতটার দিকে তারা চূড়ায় পৌঁছান। নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত ঘণ্টা পর চূড়ায় পৌঁছানোর কারণে ফেরার পুরো পথ তাদের অন্ধকারে পাড়ি দিতে হয়েছে।

চূড়া থেকে নামার প্রায় এক ঘণ্টা পর তিন তরুণ এক পর্যায়ে মূল পথ থেকে সরে গিয়ে মাড ক্রিক ক্যানিয়নে ঢুকে পড়েন। তাদের যে পথে নামার কথা ছিল, তার তুলনায় এলাকাটি ছিল অনেক বেশি বিপজ্জনক। প্রায় ১১ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় থাকা অবস্থায় তাদের একজন পড়ে গিয়ে হাঁটুতে আঘাত পান। পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়লে রাত ১২টার দিকে তারা গিরিখাতেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পাহাড়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রাত কাটানোর মতো প্রস্তুতি তাদের ছিল না। সঙ্গে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছিল না। ছিল না প্রয়োজনীয় গরম পোশাক বা আশ্রয়ের ব্যবস্থাও। পরদিন সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা তাদের অবস্থান শনাক্ত করেন।

পাহাড়ের ওপর দুর্গম স্থানে থাকায় হেলিকপ্টারে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে হেঁটেই নিচে নামতে হয় তিন তরুণকে। বেলা তিনটার দিকে তারা বেজক্যাম্পে পৌঁছান। এরপর সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দলের সহায়তায় ট্রেইলহেডের দিকে রওনা হন। শেষ পর্যন্ত তিনজনই নিরাপদে পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসেন।

উদ্ধারের পর নিজেদের ভুল স্বীকার করেন ওই তিন তরুণ। তারা জানান, নিজেদের বিচার-বুদ্ধির পরিবর্তে তারা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন। সিসকিয়ু কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, খাবার ও পানির পরিমাণ নির্ধারণে এআইয়ের পরামর্শ নেওয়া ছিল তাদের অন্যতম বড় ভুল। আট ঘণ্টার অভিযানের হিসাব ধরে তারা খাবার ও পানি সঙ্গে নিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযান পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলায় সেই পরিমাণ যথেষ্ট হয়নি। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, শুধু জেমিনাইয়ের ভুল পরামর্শের কারণেই তিন তরুণ বিপদে পড়েননি। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও চূড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া, অন্ধকারে পাহাড় থেকে নামা, পথ নির্দেশের প্রধান ব্যবস্থা হারিয়ে ফেলা, মূল পথ থেকে সরে যাওয়া এবং পাহাড়ে রাত কাটানোর মতো প্রস্তুতি না থাকা সবকিছু মিলেই তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

উদ্ধারের পর জানা যায়, অভিযানের প্রস্তুতিতে তারা জেমিনির ওপর অনেকটাই নির্ভর করেছিলেন। বিশেষ করে খাবার ও পানি কতটা নিতে হবে, সে বিষয়েও এআইয়ের পরামর্শ নিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, জেমিনি তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাবার ও পানি নিতে বলেছিল। আট ঘণ্টার অভিযান শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ অভিযানে পরিণত হওয়ায় সেই ঘাটতি বড় সমস্যায় পরিণত হয়।

পরদিন সকালে প্রায় সাড়ে ৯টার দিকে ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের ক্লাইম্বিং রেঞ্জাররা তাদের খুঁজে পান। আহত পর্বতারোহীকে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তিনজনকে খাবার ও পানি দেওয়া হয়। পরে উদ্ধারকারীদের সঙ্গে হেঁটেই পাহাড় থেকে নামতে হয় তাদের।

উদ্ধার অভিযানও সহজ ছিল না। প্রবল বাতাসের কারণে হেলিকপ্টারে উদ্ধারের দুটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত রেঞ্জার ও উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের সঙ্গে পায়ে হেঁটেই পাহাড় থেকে নামেন তিনজন। পরে তাদের নিরাপদে ট্রেইলহেডে ফিরিয়ে আনা হয়।

এ বিষয়ে ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের প্রধান পর্বতারোহণবিষয়ক উদ্ধারকর্মী এবং মাউন্ট শাস্তা অ্যাভালাঞ্চ সেন্টারের পরিচালক নিক মেয়ার্স বলেন, এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছর মাউন্ট শাস্তায় এআই চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করে অভিযানের পরিকল্পনা করার পর একাধিক পর্বতারোহী ও ক্যাম্পার পথ হারিয়েছেন বা বিভ্রান্ত হয়েছেন। শুধু এআই চ্যাটবটের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা জরুরি।

এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, এআই দৈনন্দিন নানা কাজে সহায়ক হলেও জীবন-মরণ পরিস্থিতিতে এর তথ্য যাচাই না করে অনুসরণ করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়, জঙ্গল বা দুর্গম এলাকায় অভিযানের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, নির্ভরযোগ্য মানচিত্র ও পর্যাপ্ত জরুরি সরঞ্জাম সঙ্গে রাখার বিকল্প নেই।