কনটেইনার খালি, কাগজে-কলমে ১২১ টন পণ্যের ভুয়া রপ্তানি

কোনো পণ্য রপ্তানি না করেও কাগজে-কলমে ১২১ টন পণ্য রপ্তানি দেখানোর চেষ্টা আটকে দিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অধিদপ্তর বলেছে, শুল্কের হিসাব রাখার ডিজিটাল মাধ্যম অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে রপ্তানি কনসাইনমেন্ট যাচাইকালে গত ৩ সেপ্টেম্বর ভ্যালমন্ট ফ্যাশনসের পাঁচটি রপ্তানি চালান শুল্ক গোয়েন্দাদের নজরে আসে। প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার ১২১ টন পণ্য রপ্তানির কথা বলা ছিল সেখানে।

ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড নামের এক কোম্পানির রপ্তানি চালান ‘সন্দেহজনক’ মনে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে খোঁজ নেন শুল্ক গোয়েন্দারা। কিন্তু সেখানে পণ্যের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি।

প্রাথমিক বিশ্লেষণেই রপ্তানির গন্তব্য দেশ, পণ্যের প্রকৃতি ও ঘোষিত মোট ওজনের মধ্যে অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হওয়ায় চালানগুলো আটকে অধিকতর যাচাই শুরু করা হয়।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রপ্তানি বাজার মূলত ইউরোপের দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপের মধ্যে বেশি রপ্তানি হয় জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও ডেনমার্কে। এছাড়া যুক্তরাজ্যও তৈরি পোশোক রপ্তানির বড় বাজার।

জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়াতেও বড় আকারে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। কিন্তু ভ্যালমন্ট ফ্যাশনসের পাঁচটি চালানের গন্তব্য দেখানো হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপিন্স। তাতে সন্দেহ হওয়ায় অধিকতর যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বন্ডেড প্রতিষ্ঠানটি বিগত এক বছরে যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে, তার তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ ‘অস্বাভাবিক’ রকম বেশি।

দাখিল করা বিল অফ এক্সপোর্ট এর তথ্য অনুযায়ী পণ্যগুলো ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো থেকে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। কাস্টমস গোয়েন্দারা তখন সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট ডিপোতে গিয়ে পণ্যগুলো পরীক্ষার জন্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।

কিন্তু ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো পণ্যই প্রদর্শন করতে পারেননি জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রপ্তানির জন্য ঘোষিত কনটেইনারগুলোতে কোনো পণ্য পাওয়া যায়নি।

তাহলে চালানগুলোর কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা কীভাবে সম্পন্ন হল, সে বিষয়ে ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো ‘সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি’ বলে অধিদপ্তর জানিয়েছে।

পাঁচ রপ্তানি চালানে কাগজে-কলমে ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি পণ্য বা ১২১ টন পণ্য রপ্তানির কথা বলা হয়েছিল। যেখানে ঘোষিত রপ্তানিমূল্য ছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় ৫ কোটি ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯২ টাকা।

কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তর বলছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়, পণ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ছাড়াই পাঁচটি চালানের বিপরীতে রপ্তানি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, যা কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের নজরদারি ও বিশেষ তৎপরতায় ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।

তবে পণ্য ছাড়াই কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা কীভাবে শেষ হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

নিয়ম অনুযায়ী কাস্টমস হাউস, আইসিডি, চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রপ্তানি পণ্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট কন্টেইনার ডিপোতে প্রবেশ করে এবং প্রয়োজনীয় কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

কিন্তু এ ঘটনায় পণ্য ছাড়াই কীভাবে রপ্তানির কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন দেখানো হল এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা উদঘাটনে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান ‘অব্যাহত রয়েছে’ বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক কোম্পানি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ডিপোর সংশ্লিষ্টতা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।