ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ছাত্রদল কর্মী কর্তৃক শিবির নেতাকে থাপ্পড় দেওয়ার জেরে গত শনিবার ক্যাম্পাসে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ক্যাম্পাস জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) প্রশাসনের সাথে আলোচনার পর বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে সম্মিলিত একসংবাদ সম্মেলনে উভয় পক্ষের নেতারা পারস্পরিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতি বজায় রাখার বার্তা দেন।
জানা যায়, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সমাবেশের ঘোষণা দেয় স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। এতে করে আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়, করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষকে নিয়ে পরিবেশ শান্ত করার চেষ্টা করা হয়। এরই পরিপেক্ষিতে শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সাথে আলোচনায় বসে প্রশাসন। পরে, দুপুরে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতারা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আশ্বাস দেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোঃ শাহীনুজ্জামান, শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন, সদস্য সচিব রাফিজ আহম্মেদ, শাখা শিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী, সেক্রেটারী রাশিদুল ইসলাম রাফি, ইবি-মিরপুর জোনের সার্কেল এসপি মাহমুদ, ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশিদসহ অন্যান্যরা।
এসময় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ইবি সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বহিরাগতদের কোন স্থান নেই। বহিরাগতরা যদি ক্যাম্পাসে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করে তবে ছাত্রদল, শিবির ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো মিলে প্রতিহত করা হবে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করছি। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটি যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা তা মেনে নেব।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টির সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি। ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আমরা প্রশাসনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব। জামায়াত বা বিএনপি—যে দলেরই কেউ হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে বা বাইরে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটালে আমরা কাউকে ছাড় দেব না, প্রয়োজনে তাকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করবো।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিবির ও ছাত্রদল সব পক্ষের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সবাই সমন্বিতভাবে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আর কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে তারা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।
এ বিষয়ে ইবি-মিরপুর জোনের সার্কেল পুলিশ সুপার মাহমুদ বলেন, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য রয়েছে। আমরা যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বদ্ধপরিকর। ক্যাম্পাসে কিংবা ক্যাম্পাসের বাইরে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছি।
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মতিনুর রহমান বলেন, প্রশাসন, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবার আন্তরিক সহযোগিতার কারণে বড় একটা সংকট সমাধানের সম্ভব হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করেছেন। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদেরকে মাত্র দুই দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন আসার পরে পরবর্তী র্পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে শিবির নেতাকে ছাত্রদল কর্মীর থাপ্পড় মারার ঘটনা ঘটে। ঘটনার অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মী তার কক্ষে আটকা পরেন। এসময় শিবিরের নেতা-কর্মীদেরকে তার কক্ষের বাহিরে ধাক্কাধাক্কি ও দরজায় লাথি দিতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর উভয় পক্ষ সমাধানের উদ্দেশ্যে প্রভোস্ট কক্ষে বসে। সেসময় অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মীকে আনতে গেলে শিবির নেতা-কর্মীরা উত্তেজনা সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ দিয়ে বের হয়ে যায় ছাত্রদলের নেতারা।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রদল কর্মীদের সাথে শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সেখানে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে অভিযুক্তকে উদ্ধার করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠে শিবির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।
এরপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল থেকে বেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেন। এসময় স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে স্থানীয় জামায়াতের দুই কর্মী শহীদুল ও বাবলু আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়। উভয় পক্ষকে নিয়ে প্রক্টর অফিসে আলোচনায় বসে প্রক্টরিয়াল বডি। এ সময় তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরে, শহীদ জিয়াউর রহমান হলের দুইজন ছাত্রের মধ্যে সংঘঠিত ঘটনা তদন্তের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেন।