সুতা আমদানিতে কড়াকড়ি, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এনবিআরের

রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় সুতা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন বিধান অনুযায়ী, বন্ড সুবিধার আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানির সুযোগ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানাগুলো এ সুতা আমদানি করতে পারবে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) এ বিষয়ে একটি সাধারণ আদেশ জারি করেছে এনবিআর। আদেশটি জারির সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।

নতুন আদেশ অনুযায়ী, ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানি করা সুতা তখনই অবমুক্ত করা হবে, যখন ওই সুতায় তৈরি পণ্যের রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত হবে। পাশাপাশি সুতা আমদানি ও অবমুক্তির ক্ষেত্রে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ অথবা বিটিএমএ—এই তিন সংগঠনের যেকোনো একটির প্রত্যয়নপত্র সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এর ফলে বন্ডেড রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে কাঁচামাল আমদানিতে এখন নন-বন্ডেড কারখানাগুলো যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, একই প্রক্রিয়ায় ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে।

দেশে মোট সুতা আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা। গত বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সুতা আমদানি হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানিতে পোশাক রপ্তানিকারকদের ব্যয় বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করে আসছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি সুপারিশ এনবিআরে পাঠানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীকে ওই কমিটির প্রধান করা হয়। গত ২০ আগস্ট কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট এইচএস কোড—৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে নতুন শর্ত আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় এনবিআর মঙ্গলবার নতুন আদেশ জারি করেছে। তবে আদেশ জারির আগে যেসব চালান ইতোমধ্যে জাহাজীকরণ করা হয়েছে, সেসব চালানের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে পোশাক খাতের শীর্ষ দুই সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।

সংগঠন দুটির অভিযোগ, একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ স্থানীয় মিল থেকে সুতা কেনা বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে। তাদের দাবি, এ সিদ্ধান্ত দেশের তৈরি পোশাক খাতকে মারাত্মক সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো পূর্ব আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।

সংগঠন দুটির দাবি, আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। বৈঠকের পর বিষয়টি উত্থাপিত হলে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএকে যৌথভাবে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়কে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। আলোচ্যসূচির বাইরে থাকা বিষয়টি বৈঠকের কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করায় ব্যবসায়ী নেতারা বিস্ময় ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

চিঠিতে বলা হয়, নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত বন্ড ব্যবস্থা হঠাৎ পরিবর্তন বা ডি-বন্ডিং ব্যবস্থা চালু করা হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাবে এবং দেশের রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্যসচিব ও এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছেও চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে এনবিআরের নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। বিশেষ করে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্তির সঙ্গে রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।

বিটিএমএর ভাষ্য, সম্প্রতি পাওয়া তথ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত না হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার আর্থিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন না হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

সংগঠনটি জানায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নন-বন্ডেড রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সুতা ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় সরাসরি রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও উদ্যোগটিকে স্বাগত জানানো হয়।

বিটিএমএ বলছে, বর্তমানে একই সুবিধা বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ায় সুতা আমদানি বা রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই।

সংগঠনটির মতে, নতুন ব্যবস্থা টেক্সটাইল শিল্পের সুরক্ষা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ এবং বন্ড ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়ের পূর্ণ প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত হওয়ায় সরকারের উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।