গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মকশ বিলকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হলে এটি হতে পারে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ জলাভূমি, নৌভ্রমণ, পাখির বিচরণ এবং গ্রামীণ পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে এখানে পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে মকশ বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি ও নৌভ্রমণের সুযোগ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে। শরৎকালে কাশফুল, শীতকালে অতিথি পাখির বিচরণ এবং বিলসংলগ্ন গ্রামীণ জীবন পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহনকারী এই বিলকে অব্যবস্থাপনা ও দখল-দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা প্রয়োজন। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রথমেই বিলের সীমানা নির্ধারণ, দখল ও ভরাট বন্ধ এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, মকশ বিলকে কৃত্রিম বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তর না করে পরিবেশবান্ধব বা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব। এজন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে নৌঘাট, নিরাপদ নৌভ্রমণ, পর্যটকদের বসার স্থান, বিশুদ্ধ পানি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নামাজের স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে । এ ছাড়া বিলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নির্দিষ্ট এলাকা 'নীরব অঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা, পাখি শিকার বন্ধ, দেশীয় জলজ উদ্ভিদ ও গাছ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় জেলে, নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মকশ বিলকে ঘিরে স্থানীয় খাবার, পিঠা, হস্তশিল্প ও কৃষিপণ্যের বাজার গড়ে তোলার পাশাপাশি বর্ষাকালে নৌকাবাইচ, লোকসংগীত, কবিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও তুলে ধরা সম্ভব হবে ।
তবে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের আগে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিল এলাকায় যাতায়াতের সড়ক ও সেতুগুলোর টেকসই সংস্কার, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড এবং জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে একটি বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে মকশ বিল গাজীপুরের একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে একদিকে বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফকরুল হোসাইন বলেন, মকশ বিলকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র করার পরিকল্পনা রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের, এজন্য স্থান নির্বাচন করা হচ্ছে। পাশাপাশি মকশ বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমরা প্রতি মাসে মোবাইল কোর্ট করছি ।
কালিয়াকৈর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পরিবেশ ও সামাজিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আহমাদ উল্লাহ জানান, মকশ বিল কেবল একটি জলাভূমি নয়, এটি কালিয়াকৈরের প্রাকৃতিক ফুসফুস ও পরিবেশগত ভারসাম্যের এক অমূল্য স্তম্ভ। যান্ত্রিক শহরের কোলঘেঁষে থাকা এই বিলকে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। তবে উন্নয়নের নামে কোনোভাবেই যেন এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ইকোসিস্টেম নষ্ট না হয়।