চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থ ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক এ আলোচনাসভার আয়োজন করেছে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা, বিদেশি কোম্পানিকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া, বন্দরের সক্ষমতা, জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যত্ অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার তত্পরতা নতুন নয়। আগেও এ ধরনের চেষ্টা হয়েছিল। সরকার পরিবর্তন হলেও আমরা বাস্তব কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন দেখতে পাই না। একই ধরনের বিষয় বারবার ফিরে আসছে। কিছু গোষ্ঠী একইভাবে কাজ করছে এবং একই ধরনের অস্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার যে উদ্যোগ চলছে, তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলে সরকারকে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে জনগণের সামনে তা উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন প্রশ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেওয়া হচ্ছে না এবং চুক্তিগুলোও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লাভজনক প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির হাতে উদ্বৃত্ত অর্থও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বন্দরের মাসুল বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে দেশের অর্থনীতির ‘হূদপিণ্ড’ হিসেবে বিবেচিত এই বন্দর অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্য কোনো সাধারণ বন্দরের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
তিনি বলেন, বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে হলে কাস্টমস ব্যবস্থার সংস্কার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানি নিয়ে আসার সঙ্গে এসব সমস্যা সমাধানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। আলোচনাসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে বিদেশি অপারেটরের হাতে টার্মিনাল তুলে দেওয়ার আগে দেশের প্রকৃত সক্ষমতা ও ভবিষ্যত্ চাহিদা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আলোচনাসভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন থাকলেও জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদেশি অপারেটরের হাতে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দেওয়ার আগে চুক্তির সব শর্ত, সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জনগণের সামনে প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।