কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার পাঁচটি পানির ফিল্টারের চারটিই দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। একাধিকবার প্রশাসনকে অবহিত করেও সেগুলো মেরামত না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সাধারণ ট্যাংকের পানি পান করতে হচ্ছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়ছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের খাবার ও পানির জন্য ক্যাফেটেরিয়ায় পাঁচটি পানির ফিল্টার স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটিই দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। ফিল্টারগুলো অকেজো হয়ে পড়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত সেগুলো সচল করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পানির ট্যাংকিতে ময়লার স্তর জমে থাকার অভিযোগও রয়েছে।
ক্যাফেটেরিয়া ম্যানেজার ফরিদ উদ্দিন বলেন, ফিল্টারগুলো নষ্ট থাকার বিষয়টি প্রশাসনকে একাধিকবার দরখাস্ত দিয়ে জানানো হয়েছে। আমাদের ক্যাফেটেরিয়ার ফিল্টারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নষ্ট। বর্তমান উপাচার্য স্যার আসার আগেই আমি এ বিষয়ে প্রশাসনকে পাঁচটি দরখাস্ত দিয়েছি। নতুন উপাচার্য স্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিতীয় দিনই ক্যাফেটেরিয়া পরিদর্শনে এলে আমি নিজে তাকে ফিল্টারের অবস্থা দেখিয়েছি। তাই ফিল্টার নষ্ট থাকার বিষয়টি প্রশাসন পুরোপুরি অবগত।’
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং তিন শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ খাবার ও পানির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এই একমাত্র ক্যাফেটেরিয়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সেখানে খাবার গ্রহণ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে ফিল্টারগুলো নষ্ট থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ক্যাফেটেরিয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী খাবার ও পানি গ্রহণ করলেও নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের সাধারণ ট্যাংকের পানি পান করতে হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাজহারুল হক বলেন, ‘ক্যাফেটেরিয়ার ফিল্টারটি বেশ কয়েক মাস ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ফলে বাধ্য হয়ে আমাদের অপরিশুদ্ধ পানি পান করতে হচ্ছে। এতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত ফিল্টারগুলো মেরামত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করুক।’
মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আবু হানিফ বলেন, ‘বেশ কিছুদিন যাবৎ ক্যাফেটেরিয়ার খাবার পানির ফিল্টারটি নষ্ট থাকায় আমাদের সাধারণ ট্যাংকের পানি পান করতে হচ্ছে। এতে আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সার্বিক দিক বিবেচনা করে প্রশাসন যেন যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে খাবার পানির ফিল্টারটি মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
তবে ফিল্টার মেরামতের দায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। ক্যাফেটেরিয়া পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক মো. হারুন বলেন, ‘এ বিষয়ে চাহিদা দেওয়া হয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনে। ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশন এটার জন্য দায়িত্বশীল। আমি তাদের এ বিষয়ে বারবার বলেছি। তারা কেন এতদিন পর্যন্ত সাড়া দিচ্ছেন না, সেটা আমি বুঝতে পারছি না।’
প্রকৌশল দপ্তরের পরিচালক প্রকৌশলী এস. এম. শহীদুল হাসান ফিল্টার মেরামতের দায়িত্ব তাদের নয় জানিয়ে বলেন, ‘আমরা যেহেতু এটি ক্রয় করিনি, এটার কতদিনের ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি ছিল, তা বলতে পারব না। কারা এটি স্থাপন করেছে, সেটাও জানি না। এখন তাদেরই ডাকতে হবে, যারা মেশিনটি লাগিয়ে দিয়েছে। আমি স্যারকে বারবার বলেছি, এটি বাইরের লোক দিয়ে ঠিক করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ছাদের ট্যাংকি পরিষ্কার করেছি। সাবমার্সিবল পাম্প ও বিদ্যুৎ সংযোগও দেখছি। কিন্তু ফিল্টার আমাদের আওতার মধ্যে নেই। আমাদের আওতার মধ্যে যা আছে, আমরা সবই করছি।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মুজিবুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘আমার কাছে কোনো আবেদন আসেনি। যেহেতু আমার কাছে কোনো আবেদন আসেনি, এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই। যদি আবেদন আসে, তখন অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন বলেন, অবশ্যই পানির ফিল্টার চেঞ্জ করা দরকার এবং এগুলা করা অনেক আগেই উচিত ছিল। আমি তো জানতাম না, আজকেই জানলাম। আমাদের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের কথা হলো যদি পানির ফিল্টার নষ্ট হয়ে থাকে, ইমিডিয়েটলি রিপ্লেস করা দরকার। যদি এ ব্যাপারে প্রশাসনিক কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হয়, তা আমরা অবশ্যই করব।
অপরিশুদ্ধ পানি পানের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের ইনচার্জ ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘পানি যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, টাইফয়েড জ্বর এবং হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাসের মতো পানিবাহিত রোগ হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগের মতো স্বাস্থ্য-ঝুঁকিও রয়েছে।’