নিখোঁজ ২০৩৮ শিশুর সন্ধান মেলেনি এখনো

গত বুধবার ঢাকার কমলাপুর এলাকা থেকে সাত বছরের অনিক (ছদ্মনাম) বাবা-মার সঙ্গে রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে ট্রেনে উঠে পড়ে। ময়মনসিংহ স্টেশনে নামার পর আশপাশের যাত্রীরা বুঝতে পারে শিশুটি একা। তাদেরই একজন কল করেন শিশু সহায়তা হেল্প লাইন ১০৯৮-এ। তারা শিশুটিকে রেলওয়ে পুলিশের কাছে দিতে বলে। রেলওয়ে পুলিশের তত্ত্বাবধানে তাকে ঢাকায় আনা হয়। স্থানীয় সমাজকর্মীরা কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে শিশুর পরিবারের মাইকিং শুনতে পান এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরই মধ্যে পরিবার থানায় একটি জিডি করে।  

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার জিডির তথ্য পুলিশ হেড কোয়ার্টারে পাওয়া  গেছে। তবে নিখোঁজের এই সংখ্যা মানেই তারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ এমন নয়। অনিকের মতো অনেকেই ফিরে আসে পরিবারে। পুলিশ সদর দপ্তরের যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে, তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান মেলেনি। তারা এখন কোথায়? কেন হারিয়ে যায় শিশুরা?—এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে।

নিখোঁজ হচ্ছে নানা বয়সি শিশু :পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি সাধারণ ডায়ারি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে, এখনো সন্ধান মেলেনি ৬৮ জনের। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এখনো ১ হাজার ৯৭০ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কেন হারিয়ে যায় শিশুরা :ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন জানান, হারিয়ে যাওয়া শিশুদের একটা বড় অংশ ১৪-১৭ বছরের মধ্যে, তারা বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে যায়। শিশু হারিয়ে যাওয়া বিষয়টি আমরা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখি এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য—অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তির কারণে এই বয়সি শিশুরা নিখোঁজ হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, অনেক শিশু অপহরণের শিকার হয়। এক শ্রেণির মানুষ এই শিশুদের দিয়ে ভিক্ষা এবং নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করায়—এরাই একসময় নানা রকম অপরাধে যুক্ত হয়।

হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপর চৌধুরী মো. মোহাইমেন ইত্তেফাককে বলেন, সাধারণত মাদ্রাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের শাস্তি দেওয়া, বাবা-মার দ্বিতীয় বিয়ে, ঝগড়া, অভাব এমন কারণে শিশু নিখোঁজের জিডিগুলো হয়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে পাচার হওয়া, গৃহশ্রমিক নির্যাতন, অপহরণ ও প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, বছরে ৫ হাজার বেশি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কল আসে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত হেল্পলাইন ১০৯-এর ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম বলেন, সাধারণত ঢাকা শহরে কিডন্যাপের ফোন বেশি আসে। তারা স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেন। জরুরি সহায়তার হেল্পলাইন ৯৯৯ থেকে জানা যায়, লঞ্চঘাট, রেললাইন থেকে শিশু হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তারা বেশি ফোন কল পান। এখন অনেক মাদ্রাসায় বলাত্কারের ভয়েও শিশুরা পালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শিশু পাচারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিকিং’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকি হিসেবে জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, শিশুবিয়ে এবং অনিরাপদ অভিবাসনের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

নিখোঁজের জিডি বাড়ছে :পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কমে ১৬ হাজার ৪১৪ হলেও ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে। পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালুর ফলে নিখোঁজ সংক্রান্ত  জিডি করার সুযোগ সহজ হওয়ায় এর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নিখোঁজের সংখ্যা দেখার ক্ষেত্রে শুধু কতজন নিখোঁজ হয়েছে তা নয়, কতজন উদ্ধার হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ—এই দুই তথ্য একসঙ্গে দেখা জরুরি।

হারিয়ে যাওয়া শিশুরা কোথায় যায় :পুলিশের প্রকাশিত তথ্য থেকে নিখোঁজ হওয়া সব শিশুর জন্য একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের কথা বলা যায় না। রাজধানীর কমলাপুরে মেয়েদের সরকারি পথশিশু পুনর্বাস কেন্দ্রে ৮০ জন শিশু আছে, যার মধ্যে ২০ জন কন্যা শিশু। কেন্দ্রের ইনচার্জ ও শিশু পুনর্বাসন ব্যবস্থাপক কামরুন নাহার রত্না জানান, ৭ থেকে ১৮ বছরের মেয়ে শিশু এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে আছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য পরিবারে পুনর্বাসন করা, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ কম থাকে।

মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী ৩৭ বছর ধরে নারী ও শিশু পাচার নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এখন সাইবারক্রাইম অনেক বড় একটা কারণ শিশু পাচারের ক্ষেত্রে। শিশুরা ঘরে বসেই অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কন্যা শিশুদের ফিরিয়ে আনা হলেও তারা পরিবারে ফিরে যেতে পারে না। তাই তিনি পাচার রোধে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া, এসব বিষয়ে দক্ষ পুলিশ, সাংবাদিক ও সরকারি আইনজীবী বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশ ও পাঠ্যসূচিতে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।